• মঙ্গলবার ২৩ জুলাই ২০২৪ ||

  • শ্রাবণ ৭ ১৪৩১

  • || ১৫ মুহররম ১৪৪৬

দলিলপ্রতি গুনে গুনে ঘুষ নেন সাব-রেজিস্টার পাভেল

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ৬ জুলাই ২০২৪  

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মো. খায়রুল বাশার ভূঁইয়া পাভেলের বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তিনি কালিহাতী উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদানের পর থেকে দাতা-গ্রহীতাদের প্রতিটি দলিল রেজিস্ট্রিতে সরকারি উৎসে করের সমপরিমাণ বাড়তি অর্থ দাবি করে আসছেন। ঐ পরিমাণ বাড়তি অর্থ না দিলে তিনি কোনো দলিলই রেজিস্ট্রি করেন না। এজন্য উপজেলায় দলিল রেজিস্ট্রির হার অর্ধেকে নেমে এসেছে।
এছাড়া তিনি দলিল লেখক এবং দাতা-গ্রহীতাদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করে থাকেন। তিনি প্রকাশ্যে দলিলপ্রতি অর্থ দাবি করেন। টাকা ছাড়া দলিল সম্পাদন বন্ধ রাখেন।

সরেজমিন জানা গেছে, টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মো. খায়রুল বাশার ভূঁইয়া পাভেলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রতিবাদে নেমেছেন স্থানীয় দলিল-লেখকরা। তারা গত ২৫ জুন দিনব্যাপী কর্মবিরতিও পালন করেন। এখনো তাদের কলম বিরতি চলছে। এর ফলে জমি নিবন্ধন করতে আসা দাতা-গ্রহীতারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

দলিল-লেখকদের অভিযোগ, কালিহাতীতে সম্প্রতি আসা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মো. খায়রুল বাশার ভূঁইয়া পাভেল প্রতি দলিলের মূল্যের ওপর ১ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করেন। না হলে তিনি কোনো দলিল করতে চান না। তাছাড়া প্রতিটি দানপত্র দলিল, এওয়াজ দলিল, ওছিয়তনামা দলিল, বায়না দলিল, না-দাবি দলিল, বাটোয়ারা দলিল, হেবা দলিল থেকে ৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ নিয়ে থাকেন পাভেল। এমনকি উত্তরাধিকার দলিলেও অতিরিক্ত টাকা দাবি করেন। 

দলিল-লেখকদের কেউ প্রতিবাদ করতে চাইলে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যসহ অসদাচরণ করে থাকেন সাব-রেজিস্ট্রার। তিনি অফিসের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বিভিন্ন সময়ে দলিল লেখকরা এর প্রতিবাদ করলেও কোনো সমাধান হয়নি। উল্টো তাদের সঙ্গে অসদাচরণসহ নানা কারণ দেখিয়ে দলিল না করার হুমকি দিয়ে অনিয়মের মাত্রা বাড়িয়ে দেন তিনি। 

দলিল-লেখকরা বলেন, নানা অজুহাতে তিনি সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন হয়রানি করে আসছেন। আমরা যারা দলিল-লেখক রয়েছি তাদের মধ্যে অনেকেই বয়স ও পেশায় সিনিয়র ব্যক্তি রয়েছেন, তাদের সঙ্গে অনেক খারাপ আচরণ করেন। মো. খায়রুল বাশার ভূঁইয়া পাভেলের সব ধরনের লেনদেন করে থাকেন তার অফিসের কর্মচারী আরতি রানী।

সাব রেজিস্ট্রার বিলাস বহুল গাড়ি নিয়ে অফিসে যাতায়াত করে থাকেন। ২২ হাজার টাকা স্কেলের বেতন হলেও তিনি কীভাবে বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।

উপজেলার বাসিন্দা আফসার আলী নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, বাবার মৃত্যু হওয়ার পর ভাইদের মাঝে জমি বণ্টননামা করার জন্য গেলে আমাদের কাছে দলিল লেখক দ্বারা ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। ঘুষ দিতে রাজি না হওয়ায় সাব রেজিস্ট্রার বণ্টননামা করে দেননি।

কালিহাতি উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাসুম হোসেন  বলেন, গত কোরবানির ঈদের আগে সাব রেজিস্ট্রারের কাছে এক কোটি টাকা দামের একটি দলিল রেজিস্ট্রি করার জন্য গেলে তিনি ১৮ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। পরে তিনি ১২ লাখ টাকায় রাজি হন। এক পর্যায় তিনি বলেন নগদ ১০ লাখ ও কাজের পরে বাকি ২ লাখ টাকা দিতে হবে। কিন্তু জমি ক্রয় করা ব্যক্তি এত টাকা ঘুষ দিতে রাজি না হওয়ায় দলিলটি করা হয়নি। এরকম আরো অনেক প্রমাণ রয়েছে এই সাব রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে।

দলিল লেখক সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম  বলেন, বিগত দিনে যেসব সাব রেজিস্ট্রার ছিলেন, তারা গ্রহীতাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন। কিন্তু এই সাব রেজিস্ট্রার সব সময় দুর্ব্যবহার করেন। আমাদের সমিতির দুইজন লেখককে কয়দিন আগে কাগজে সামান্য ভুল থাকার কারণে তার অফিস কক্ষে ৬ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখেন। আইন আছে, সেই আইন মোতাবেক তিনি বিচার করবেন। কিন্তু এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখার অর্থ হয় না। আমরা দলিল লেখকরা ভয়ে আছি। এই সাব রেজিস্ট্রারের অনেক টাকা। তিনি কখন কী করেন- আমরা সেই ভয়ে আছি।

অভিযোগ প্রসঙ্গে সাব রেজিস্ট্রারের মো. খায়রুল বাশার ভূঁইয়া পাভেলকে ঘুষ লেনদেনে সহযোগিতা করা আরতি রানী বলেন, আমার নামে সব অভিযোগ মিথ্যা। সরকারি ফি’র বাইরে কোনো টাকা নেয়া হয় না।

সরকারি ফি যদি না নিতে পারি তাহলে সরকারকে বলেন বন্ধ করে দিতে।  তাহলে নেবো না, না হলে আমার স্যার যদি বলেন- টাকা নেয়া যাবে না তাহলে নেব না। 

এ বিষয়ে উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মো. খায়রুল বাশার ভূঁইয়া পাভেল তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ সত্য নয়। আমি সরকারি খরচের বাইরে কারো কাছ থেকে বাড়তি কোনো টাকা নেইনি। জমি নিবন্ধন আইন দিনদিন আপডেট হচ্ছে। নতুন ভূমি আইন বাস্তবায়নে দলিল-লেখকদের বা জমি মালিকদের আপত্তি থেকে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল জেলা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রেজিস্ট্রার মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, যদি সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের কোনো অভিযোগ থাকে, তহালে তদন্ত করে অভিযোগের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেবো।

টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক কায়সারুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল