• মঙ্গলবার ২৩ জুলাই ২০২৪ ||

  • শ্রাবণ ৭ ১৪৩১

  • || ১৫ মুহররম ১৪৪৬

ভূঁইয়াদের দখলেই ১৫ একর বনভূমি

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ৬ জুলাই ২০২৪  

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার চারভাগের তিনভাগই বনভূমি দ্বারা বেষ্টিত। এই বনভূমি শাল, গজারি, মেহগনি, আকাশমণিসহ বিভিন্ন ফলদ ও ঔষধি বৃক্ষরাজিতে পূর্ণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক বনায়ন। কিন্তু বন বিভাগে কর্মরত কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী রাষ্ট্রীয় এই সম্পদ হরিলুটের সুযোগ করে দিয়েছেন। স্থানীয় যারা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছেন, তাদের অনেকেই বিষয়টি স্বীকার করেছেন। আবার অনেকেই ক্ষমতার কারণে যুগের পর যুগ একরের পর একর জমি দখল করে আসছেন। সরেজমিন অনুসন্ধানে জমি দখলের এমন ভয়ঙ্কর চিত্র উঠে আসে।
এলাকাবাসী বলছেন, বন বিভাগের জমি কিছু ক্ষেত্রে অসচ্ছল, দরিদ্র বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে লিজ-বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। এর বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে লিজ-বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ঐ কর্মকর্তারা বিভিন্নজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে শুরু করে কলা, আনারস, লেবু ও সবজির বাগান করার সুযোগ করে দিচ্ছেন। কর্মকর্তারা যেন রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসন ও বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এলাকার প্রভাবশালীরা এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ ১৯২৭ সালের সংশোধিত বন আইন এবং ২০১২ সালের বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ আইনে সংরক্ষিত বনে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ, ফল, সবজির বাগান কিংবা ব্যক্তিগত কাজে পরিচালনা না করার নির্দেশ রয়েছে। অথচ এখানকার এক ভূঁইয়াদের দখলেই রয়েছে প্রায় ১৫ একর বনভূমি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘাটাইলের সাগরদীঘি এলাকায় ভূঁইয়াদের আধিপত্য অনেক আগে থেকেই। তাদের দখলে বনের প্রায় ১৫ একর জমি। এসব জমি দেখভালের দায়িত্বে আছেন ভূঁইয়া বংশের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি খসরু ভূঁইয়া। বয়স ৮০ বছর ছুঁইছুঁই। বাড়ি সাগরদীঘি ইউনিয়নের মালিরচালা গ্রামে। তাদের দখল করা ৩০৮ দাগের জমির অবস্থান মালিরচালা ও পাগারিয়া মৌজায়। এই দুই মৌজা ভেদ করে চলে গেছে ঘাটাইল-সাগরদীঘি সড়ক। ঐ এলাকায় সড়কের দুই পাশেই তাদের রাজত্ব। ভূঁইয়াদের বন দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে মালিরচালা গ্রামের কেউ ভয়ে কথা বলতে চাননি।

দখলকৃত জমিসংলগ্ন স্থানের নামকরণ করা হয়েছে আমতলা। সেখানে পরিচয় গোপন করে শ্রমিক সেজে চা পানের ছলে কথা হয় দোকানদারসহ অন্যদের সঙ্গে। 

তারা জানান, মালিরচালা মৌজায় ভূঁইয়াদের দখল করা জমি বছরে বিঘাপ্রতি (৫০ শতাংশে এক বিঘা) ৩৮ হাজার টাকায় ইজারা নিয়ে কলা ও পেঁপে চাষ করেছেন খসরু ভূঁইয়ার ভাতিজা সজিব ভূঁইয়া। পাগারিয়া মৌজায় বিভিন্ন জাতের কলা চাষ করেছেন পাশের উপজেলা সখীপুরের আরিফ হোসেন নামে এক ব্যক্তি। জমিগুলো রেকর্ডভুক্ত না বন বিভাগের–এমন প্রশ্নে স্থানীয়রা বলেন, কিছু রেকর্ড আর বাকিটা বন বিভাগের।

বনের জমি কীভাবে খসরু ভূঁইয়া দখল করে ভোগ করছেন? বন বিভাগ কিছু বলছে না– এমন প্রশ্ন শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন অনেকে। তাদের ভাষ্য, দখলকৃত জমির অবস্থান ঘাটাইল-সাগরদীঘি সড়ক ঘেঁষে। এই সড়ক দিয়েই বন কর্মকর্তাদের চলাচল। তারা দিনেও চলেন চোখ বন্ধ করে। তাহলে বন দখল দেখবেন কী করে?

ঘটনাস্থল থেকে বন বিভাগের সাগরদীঘি বিট অফিসের দূরত্ব তিন কিলোমিটারের বেশি নয়।

চায়ের দোকানে উপস্থিত অনেকেই জানান, খসরু ভূঁইয়ার ছোট ভাই নিজাম ভূঁইয়ার এক আত্মীয় বন বিভাগে চাকরি করেন। তার মাধ্যমেই নাকি সব সমাধান হয়। মধ্যবয়সী একজন বলেন, ভূঁইয়াদের হাত অনেক লম্বা।

ঘাটাইল উপজেলাটি মূলত পাহাড়ি অঞ্চল। এখানে মোট বনভূমি ২৫ হাজার ৭১১ একর।

বন বিভাগের তথ্যমতে, ২ হাজার ৫৩ একর বনের জমি বেদখল। এসব জমিতে বড় বড় দালান, লেবু, মালটা, কলা, পেঁপে ও ড্রাগনের বাগান করেছে দখলদাররা। অনেকে বনের জমি দখল নিয়ে ইজারা দিয়ে লাভবান হচ্ছেন।

ভূঁইয়াদের দখলে থাকা মালিরচালা মৌজায় পেঁপে ও কলা বাগান করেছেন সজিব ভূঁইয়া। তিনি বলেন, বছরে বিঘাপ্রতি ৩৮ হাজার টাকায় খসরু ভূঁইয়ার কাছ থেকে ১০ বিঘা জমি ইজারা নিয়েছি। এর আগেও প্রায় ২০ বছর ঐ জমিতে কলাচাষ করেছেন সখীপুরের ময়না মেম্বার। 

তিনি বলেন, ভূঁইয়াদের কাছে থেকে ১৪ একর ৫৫ শতাংশ জমি ইজারা নিয়েছিলাম। তার জানা মতে, কিছু জমি রেকর্ড আর বাকিটা বন বিভাগের। 

পাগারিয়া মৌজায় কলা বাগান করেছেন আরিফ হোসেন নামে এক ব্যক্তির মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা জানান, বিঘাপ্রতি একই দামে ইজারা নিয়েছেন আরিফ।

বনের জমি দখল করার কথা স্বীকার করে খসরু ভূঁইয়া বলেন, মালিরচালা ও পাগারিয়া মৌজায় আমাদের রেকর্ডভুক্ত জমি আছে। আবার আমাদের দখলে বন বিভাগেরও কিছু জমি আছে।

বনের জমি দখলের পরিমাণ কত– এমন প্রশ্নে পরিপূর্ণ তথ্য না দিতে পারলেও অনুমান করে তিনি বলেন, মালিরচালা মৌজায় চার একর এবং পাগারিয়া মৌজায় চার একর বনের জমি তাদের দখলে আছে। বন বিভাগ এই জমি উদ্ধার করতে আসে না।

সাগরদীঘি ইউপি চেয়ারম্যান মো. হাবিবুল্লাহ জানান, বহু বছর ধরে বসবাসরত লোকজন ঘরবাড়ি পুনঃনির্মাণের সময় বন বিভাগের হয়রানির শিকার হয়। মোটা অংকের উৎকোচ না দিলে বন বিভাগ বাড়ি সংস্কার করতে দেয় না– এমন অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালীরা একরের পর একর জমি দখল করলেও বন কর্মকর্তাদের চোখে পড়ে না। তারা প্রভাবশালীদের সঙ্গে সন্ধি করেই চলেন।

বন বিভাগের সাগরদীঘি বিট কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ঐ জমিগুলো আমি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় দখল হয়নি। আমি যোগদানের পর দখল হওয়া ৫ হেক্টর জমি উদ্ধার করেছি। সামাজিক বনায়ন শুরু হলে ভূঁইয়াদের দখলে থাকা ঐ জমিও উদ্ধার করা হবে।

ঘাটাইলের ধলাপাড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা ওয়াদুদুর রহমানের ভাষ্য, বনের জমি যারা দখল করে, তালিকা করে তাদের নামে মামলা দেওয়া হয় এবং উচ্ছেদ করে বাগান করা হয়।

সাগরদীঘির ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে জমি দখলের কোনো মামলা হয়েছে কিনা– জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তবে দখলকৃত জমি উদ্ধার করে অচিরেই বাগান করা হবে।

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল