• সোমবার ১৫ জুলাই ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ৩১ ১৪৩১

  • || ০৭ মুহররম ১৪৪৬

ছিঁচকে চোর থেকে যেভাবে সিরিয়াল কিলার সাগর

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০২৩  

সাগর মিয়া। জন্মই যার আজন্ম পাপ। হত দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া সাগর ছোটবেলা থেকেই ছিলেন হিংস্র স্বভাবের। স্কুলের বারান্দায় কোনো দিন পা রাখেননি তিনি। যখন তার বয়স ৮ বছর তখন থেকেই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গিয়ে ১০-১২ দিন পর্যন্ত নিরুদ্দেশ হয়ে থাকতেন। হঠাৎ বাড়ি ফিরলেও মা-বাবার কথা শুনতেন না। গ্রামের সবার সঙ্গে মারপিট করাই ছিল তার নেশা।
এ নিয়ে দুঃখের সীমা ছিল না মা-বাবার। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দিনদিন ভয়ঙ্কর হতে থাকেন সাগর। নেশা, মাদক বিক্রি, চুরি ও মানুষকে নির্যাতন করাই ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। যুবক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি থেকে গায়েব হয়ে যান সাগর।

১৪ বছরেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না তাকে। পুরোদমে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা হয়ে যান সাগর। হঠাৎ জানা যায়, মাত্র ২০০ টাকার জন্য মধুপুরের মাস্টারপাড়ায় একই পরিবারের চারজনকে খুন করে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন সাগর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে সোজা জেলখানায়। তারপর জেল থেকে বের হয়ে কবিরাজ সেজে আরো তিন খুন।

টাঙ্গাইলে মধুপুরের ব্রাহ্মণবাড়ী গ্রামে গিয়ে জানা যায়, সাগর আলী (৩১) ছোটবেলা থেকেই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েন। নেশার টাকা জোগাড় করতে ছোটখাটো চুরি করে এলাকা থেকে বিতাড়িত। পরে সিরিয়াল কিলার।

টাঙ্গাইলের মধুপুরে চার খুনের পর ঢাকার আশুলিয়ায় তিন খুন করে র‌্যারে হাতে গ্রেফতার হয়েছেন সাগর দম্পতি। এতে দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। সাগরের নিজ এলাকার মানুষও একেবারে হতবাক। তারা সাগরের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। এসব ঘটনা রোধে আইনের শাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বাড়াতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা।

কিন্তু কীভাবে এবং কী কারণে সাগর এমন ভয়ঙ্কর খুনিতে পরিণত হলো? এসব বিষয়ে কথা হয় তার প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে। মধুপুর উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে ব্রাহ্মণবাড়ী গ্রামে সাগরের পৈত্রিক নিবাস।

সাগরের চাচাতো ভাই জমশেদ আলী বলেন, মৃত মোবারক হোসেন ও সাহেরা বেগমের ৬ সন্তানের মধ্যে সাগর সবার ছোট। সাগরের দিনমজুর বাবা শেষ বয়সে ভিক্ষা আর মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। ছোট বেলায় মা-বাবা মারা যাওয়ার পর বোনের কাছে বড় হন সাগর। প্রাথমিকেই অভাবে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। পরে নেশায় জড়িয়ে পড়েন। সেই নেশার টাকা জোগাড় করতে ছোটখাটো চুরিও করতেন। এভাবে অপরাধে যুক্ত হতে থাকেন। পরে একসময় ভিটা বাড়ি বিক্রি করে গ্রাম থেকে চলে যান।

জমশেদ আলী আরো বলেন, মধুপুরের চার খুনের মামলায় সাগর রাগের বশবর্তী হয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে আমাদের পরিবারের কয়েকজনকে জেল খাটিয়েছেন। অথচ ওরা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত না। আমাদের বংশের একজন ছেলে সিরিয়াল কিলার হয়েছে এটা আমরা মানতেই পারি না। ওর ফাঁসি চাই।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মাসুদ হোসেন বলেন, বিগত ২০১০ সালে সাগর তার এক কাছের আত্মীয়কে কুপ্রস্তাবসহ শ্লীলতাহানি করেন। এতে গ্রামীণ বিচারে তাকে মারধর করা হয়।

প্রতিবেশী হালিমা বেগম বলেন, বাবা-মা হারিয়ে অনাদরে বেড়ে ওঠেন সাগর। উশৃঙ্খলতার কারণে পাড়াপড়শি ও ভাইবোনরাও তাকে অপছন্দ করতেন। ফলে নিষ্ঠুর আচরণ নিয়েই সাগরের বেড়ে ওঠে।

সাগরের দ্বিতীয় স্ত্রী আলেয়া বেগম বলেন, রিকশা চালিয়ে নেশা ও সংসার দুটো চালানোয় অসুবিধা হওয়ায় একপর্যায়ে নেশা দ্রব্যের ব্যবসা শুরু করেন সাগর। এসবের প্রতিবাদ করায় আমাকে অমানসিক নির্যাতন করা হতো। নির্যাতন সইতে না পেরে তালাক দেই।

তিনি আরো বলেন, সাগর পরপর চারটি বিয়ে করেন। তার সর্বশেষ স্ত্রী ইশিতা বেগম। যাকে কবিরাজ সাজিয়ে গত (২৮ সেপ্টেম্বর) সাভারের আশুলিয়ার জামগড়ার ফকিরবাড়ীর মেহেদী হাসানের মালিকানাধীন ছয়তলা ভবনের চারতলার ফ্লাটে গিয়ে ভাড়াটে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানসহ তিনজনকে নেশা দ্রব্য খাইয়ে জবাই করে হত্যা করেন। এই ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় গত ২ অক্টোবর র‌্যাব-১২ গাজীপুরের শফিপুর এলাকা থেকে সাগর ও স্ত্রী ইশিতা বেগমকে গ্রেফতার করে।

এদিকে, বিগত ২০২০ সালের (১৫ জুলাই) মধুপুর উপজেলা সদরের মাস্টারপাড়ার আব্দুল গনি, স্ত্রী তাজিরুন বেগম, ছেলে তাজুল ইসলাম ও মেয়ে সাদিয়া নিজ বাসায় খুন হন। সুদ ব্যবসায়ী আব্দুল গনির প্রতিবেশী ছিলেন সাগর। সুদের কিস্তি পরিশোধ না করেই ২০০ টাকা ধার চাওয়া নিয়ে মন কষাকষি হয়। এরই জেরে মিষ্টির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ দিয়ে দুই ঘাতকের সহযোগিতায় চারজনকে নৃশংসভাবে খুন করেন সাগর।

ঘটনার তিন দিনপর র‌্যাব-১২ সাগর ও তার দুই সহযোগিকে গ্রেফতার ও লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার করেন। সাগর আদালতে গিয়ে হত্যাকাণ্ডে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। ঘটনার দেড় বছর পর টাঙ্গাইল পিবিআই আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।

সাগরের বড় বোন মইফুল জানান, তার ভাই মানসিকভাবে অসুস্থ। তাকে খুনের নেশায় ধরেছে। ছাড়া পেলেই সে মানুষ খুন করবে। ওর সাজা হওয়া দরকার। এদিকে, আশুলিয়ার তিন খুনে সাগরের গ্রেফতার হওয়ার খবর গ্রামের মানুষ জানতে পেরেছে।

মধুপুরের চার খুনের মামলার বাদী এবং নিহত গনির পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য সোনিয়া বেগম জানান, সাগরের জামিন পাওয়ার বিষয়টি সরকারি আইনজীবী কখনোই তাকে জানাননি। আশুলিয়ার ট্রিপল মার্ডারে র‌্যাবের হাতে সাগর গ্রেফতার হওয়ার খবরটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য মধুপুর থানায় গিয়েছিলেন। পুলিশ তাকে নিশ্চিত করেছে।

মধুপুর সার্কেলের এএসপি ফারহানা আফরোজ জেমি বলেন, সাগরের বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা রয়েছে। তার পরিবার অত্যন্ত গরিব। অনেক বছর ধরে তিনি এলাকা ছাড়া। শুনেছি তিনি কবিরাজি করতেন।

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল