• মঙ্গলবার ২৩ জুলাই ২০২৪ ||

  • শ্রাবণ ৭ ১৪৩১

  • || ১৫ মুহররম ১৪৪৬

পাখির খাবার কেড়ে নিচ্ছে অতিরঞ্জিত প্রেম, বিলুপ্তির পথে কদমফুল

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ৯ জুলাই ২০২৪  

আকাশ ভেঙে যখন বৃষ্টি নামে, তখনই গুনগুন করে ওঠে মন রবীন্দ্রনাথের গান—‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান’। কিংবা জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ‘দোলে শিহরে কদম, বিদরে কেয়া, নামিলো দেয়া’। অথবা এ যুগের ব্যান্ড দল ব্লু জিনসের গান—‘এক গুচ্ছ কদম হাতে, ভিজতে চাই তোমার সাথে’।
বর্ষা মানেই প্রকৃতির নিবিড় পর্যবেক্ষণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। বর্ষা মানেই তো একের পর এক কাব্যিক সময় পার করা। আর এই বর্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে কদম ফুল। এ ফুল না ফুটলে যেন বাংলায় পরিপূর্ণতা হারায় বর্ষা।

তবে নাগরিক উঠানে সেই কদমের ঘ্রাণ এখন অনেকটাই যেন অতীত। নেই আর আগের মতো বৈভব। আষাঢ়ে বৃষ্টি তো ছুঁয়েছে বৃক্ষ। তবে সেই রিমঝিম জলে কদমের কোমলতা যেন খুঁজে পাওয়া ভার। চোখ জুড়ানো ঘন সবুজ পাতার মাঝে হলুদ বন্ধুতায় চিরচেনা কদম গাছ এখন চোখে পড়ে কমই। তাই হয়তো বা শহরতলীজুড়ে কদমের শুভ্ররাগে হৃদয় রাঙিয়ে নেয়ার সুযোগ নাগরিক অবসর কিংবা ব্যস্ততায় প্রায় নেই বললেই চলে।

যাও আছে, তাও অতিরঞ্জিত প্রেমের বেদখলে! এই ফুল এতটাই সুন্দর যে, বর্ষার যেন কদম ছাড়া প্রেমই জমে না। রাস্তায় বের হলেই দেখা যায় ছোট বাচ্চারা কদম ফুলের গুচ্ছ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের বিক্রি করা ফুলে চলে তাদের অসুস্থ বাবা-মায়ের সংসার। আর এই কদম ফুল বর্ষায় যুগলের প্রেম নিবেদনের আরেক নাম। তবে বাদল ঝরলে ঝরুক, কদম যেন গাছেই থাকে, হাতে নয়।

ভাদ্রে যখন গাছে গাছে ফল থাকে না, তখন পাখিদের খাবারের আকাল চলে। কদমই তখন অনেক পাখির প্রধান আহার হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বাদুড় ও কাঠবিড়ালির জন্য। ওরাই গাছের বীজ ছড়ানোর বাহন। তাই ফুল যদি আগেই ছিঁড়ে ফেলা হয়, তবে পাখিরা খাবার পাবে না।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষক গওহার নঈম ওয়ারা এ সময়টাকে কদমবসন্ত বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘মন যতই চাক, কদমফুল ছিঁড়বেন না। কেউ হীরার আংটির বিনিময়ে চাইলেও না। কদম তিনবার পুষ্পিত  হয়। তাকে ফুটতে দিন।’

তিনি বলেন, ‘ভাদ্রমাসে যখন গাছে গাছে ফল থাকে না তখন পাখিদের, প্রাণীদের খাবারের আকাল চলে, সেটা তাদের মঙ্গাকাল। ঠিক তেমনই যেমনটা কার্তিকে আমাদের মঙ্গা হতো। ফলে ওই সময় কদম প্রধান খাবার হয়ে ওঠে বাদুড় ও কাঠবিড়ালির। ওরাই বীজ ছড়ায়। পাখ-পাখালি না খেলে কদম বীজ থেকে গাছ হবে না। কদম বাঁচাতে-পাখিদের বাঁচাতে কদম ফুল ছেঁড়া বন্ধ রাখুন। এছাড়া কদমের অনেক গুন, সেগুলো বিষয়ে নিজেদের মধ্যে তথ্যবিনিময় হওয়া জরুরি।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রেজিনা লাজ বলেন, ‘কদম ফলের ভেতরে প্রায় ৮ হাজার বীজ থাকে। পাখি, বাদুড়, কাঠবিড়ালির খুব প্রিয় এই ফল। পাখিদের খাদ্য ধ্বংস করে দিচ্ছি কিনা সেটা ভেবে দেখা দরকার এবং অযথা ফুল ছেঁড়া বন্ধ করতে হবে।’

কদম্ব মানে হলো ‘যা বিরহীকে দুঃখী করে’। তাই কদমতলে বংশীও বাঁজে মরমে। যে সুরে সবারই একটাই আবদার পথজুড়ে ছাতার মতো ছেঁয়ে থাকা কদমের বৃষ্টি ভালোবাসার গল্পটা যেন না হয়, রূপকথার কল্পকাহিনি। ঢাকা শহরসহ সারাদেশেই মাত্রাতিরিক্তভাবে কমছে কদম গাছের সংখ্যা। এখনো যদি পাখির মুখের খাবার তুচ্ছ কারণে কেড়ে নেয়া হয়, তবে বর্ষায় পাখি তো বিলুপ্ত হবেই; সঙ্গে পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা ভেস্তে যাবে।

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল