• সোমবার ১৫ জুলাই ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ৩১ ১৪৩১

  • || ০৭ মুহররম ১৪৪৬

কর আদায়ে বহুতল ভবন নির্মাণে আগ্রহী এনবিআর

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ১৮ মে ২০২৪  

রাজস্ব আদায় বাড়াতে দেশের বিভিন্ন জেলায় কর ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে তিন বিভাগ ও তিন জেলা শহরে ছয়টি বহুতল কর ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। কর কর্মকর্তাদের স্বাস্থ্যকর ও সুপরিসর দাপ্তরিক পরিবেশ নিশ্চিত করতেই বহুতল ভবনগুলো নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি তাদের থাকার জন্য নির্মাণ করা হবে ডরমিটরি। থাকবে টেনিস ও ব্যাডমিন্টন কোর্টও।

সম্প্রতি বহুতল অফিস ভবন এবং ডরমিটরি নির্মাণের এমন একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। তবে জেলা শহরে সুবিশাল বহুতল অফিস ভবন এবং কর্মকর্তাদের থাকার জন্য ডরমিটরি, টেনিস কোর্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে কর আদায় বাড়ানোর নামে এমন বহুতল ভবন নির্মাণের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩টি বিভাগীয় শহর এবং ৩টি জেলা সদরে কর ভবন নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ ধরা হয়েছে ৫৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অনুমোদন পেলে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ভবনগুলোর নির্মাণ কাজ শেষ করতে চায় বাস্তবায়নকারী সংস্থা।

জানা গেছে, প্রকল্পটির আওতায় ছয়টি বহুতল অফিস ভবন এবং কর্মকর্তাদের থাকার জন্য পাঁচটি ডরমিটরি নির্মাণ করা হবে। অফিস ভবনগুলো নির্মাণ করা হবে বরিশাল, রংপুর, সিলেট, দিনাজপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ও নোয়াখালী জেলা শহরে। বরিশাল বাদে অন্য জেলাগুলোতে নির্মাণ করা হবে পাঁচটি ডরমিটরি।

প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কর কর্মকর্তাদের জন্য বরিশালে ১০তলা, রংপুর ও সিলেটে ৯তলা, নোয়াখালীতে ৮তলা, দিনাজপুরে ৭তলা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৬তলা অফিস ভবন নির্মাণ করা হবে। ভবনের পাশাপাশি টেনিস ও ব্যাডমিন্টন কোর্টও নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের থাকার জন্য রংপুরে ৫তলা ডরমিটরি ভবন, সিলেটে ৫তলা, দিনাজপুরে ৩তলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং নোয়াখালীতে ৪তলা করে ডরমিটরি ভবন নির্মাণ করা হবে।

জানা গেছে, অফিস ভবনগুলো হবে ৫৮ হাজার ৯৩২ বর্গমিটার এবং ডরমিটরিগুলো হবে ৭ হাজার ৬৬ বর্গমিটার আয়তনের। যদিও প্রস্তাবিত জেলাগুলোয় কর কর্মকর্তা রয়েছেন হাতেগোনা কয়েকজন। অল্পসংখ্যক কর্মকর্তার জন্য সুবিশাল বহুতল অফিস ভবন এবং ডরমিটরি নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

বিভাগীয় ও জেলা শহরে এরূপ বহুতল অফিস ভবন ও ডরমিটরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে খোদ পরিকল্পনা কমিশন। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় কর ভবনে টেনিস ও ব্যাডমিন্টন কোর্ট নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের ব্যয় প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন তুলে ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়।

সম্প্রতি প্রকল্পটির ওপর পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে জেলা শহরে বহুতল ভবন নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কতজন কর্মকর্তার জন্য কতটুকু স্থান প্রয়োজন এবং তাদের প্রাধিকার কীসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে, তার বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়।

পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি এখনো যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে। বাস্তবায়নকারী সংস্থার প্রস্তাবটির বিষয়ে পিইসি সভায় আলোচনা হয়েছে। ভবনগুলোর প্রয়োজনীয়তা এবং জেলা শহরের ডরমিটরি ও টেনিস কোর্ট নির্মাণের যৌক্তিকতার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাব নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। পিইসি সভা সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের অফিস ভবন ও সাব-স্টেশন নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ২৮৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, গার্ড রুমসহ ৫টি ডরমিটরি নির্মাণে খরচ ৩৫ কোটি ৪৮ লাখ, বিদ্যুৎ বাবদ ১৩২ কোটি ৪৯ লাখ, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন বাবদ ১৪ কোটি ২০ লাখ, সীমানা প্রাচীর, গেট, অ্যাপ্রন, পার্কিং ও ঝর্ণা বাবদ ৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, অভ্যন্তরীণ রাস্তা বাবদ ২ কোটি ৪ লাখ টাকা, ভূমি উন্নয়নে ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া পিডির জন্য একটি জিপ, একটি মাইক্রোবাস এবং গণপূর্তের জন্য একটি ডাবল কেবিন পিকআপ কেনা বাবদ ২ কোটি টাকা, ফার্নিচার বাবদ ২২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, তিনটি টেনিস ও ব্যাডমিন্টন কোর্ট নির্মাণ বাবদ ৫৯ লাখ ২৭ হাজার খরচ ধরা হয়। এসব ব্যয় প্রস্তাবের বিষয়ে প্রশ্ন তুলে ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়েছে পিইসি সভায়।

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা জানিয়েছে, বাংলাদেশের মোট রাজস্ব আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও কুমিল্লা কর অঞ্চল হতে সংগৃহীত হয়। কাজের গতি বৃদ্ধি, উন্নত পরিবেশ সৃষ্টি ও করদাতাদের অধিকতর সেবা প্রদানের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়াতে পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় ও জেলা সদরে কর ভবন নির্মাণে জরুরি প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে।

এনবিআরের কর কমিশনার মো. লুৎফুল আজীম কালবেলাকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা থেকেই বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে জনবল কম থাকলেও কর আদায়ের পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে, সে কারণে জনবল বাড়াতে হবে। এজন্য যেসব জেলায় এনবিআরের নিজস্ব জমি রয়েছে সেখানে অফিস ভবন এবং ডরমিটরিগুলো নির্মাণ করা হবে। অল্প জায়গায় অধিক কার্যক্রম পরিচালনের জন্য উঁচু ভবন করা হচ্ছে। প্রাপ্যতার ভিত্তিতেই প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে দেশের রাজস্ব আদায়ের একটি বড় অংশ আসে কর থেকে। অথচ এ কর আদায়ে বাংলাদেশের অবস্থান পেছনের সারিতে। কর জিডিপির অনুপাতে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্ন। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, কাঙ্ক্ষিত কর আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছে এনবিআর, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কর জিডিপি অনুপাতের চিত্র হতাশার ও আতঙ্কের। এ অবস্থায় ভবন নির্মাণের চেয়ে কর আদায়ে মনোযোগী হওয়া উচিত।

বহুতল ভবনের বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কর আদায় বাড়াতে এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা আছে। তবে বহুতল ভবনগুলো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা আছে কি না, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার।

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল