• বৃহস্পতিবার   ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||

  • মাঘ ২৬ ১৪২৯

  • || ১৮ রজব ১৪৪৪

আজকের টাঙ্গাইল

শেখ মুজিবুর রহমান: বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ২৫ ডিসেম্বর ২০২২  

আমরা সবাই শিশিরের শুভ্রতাকে ভালবাসি। সকালের সেই ক্ষণস্থায়ী শিশিরের মতই অল্প আয়ু নিয়ে গোপালগঞ্জের তাল নারিকেল আর তমাল শিরিষ হিজল বকুল কদম সজনে গাছে ঘেরা টুঙ্গি পাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ জন্মেছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাংগালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

জীবনের এই স্বল্প যাত্রায় তিনি শুভ্রতার মতই দ্যুাতি ছড়িয়ে যাচ্ছেন অনন্তকাল ধরে। আর বাংগালী জাতি সেই দ্যুাতির আলোয় আলোকিত হয়ে বিশ্ব পরিমন্ডলে  মাথা উচুঁ করে দাড়ানোঁর স্বপ্ন দেখছে। মধুমতি নদী থেকে ভেজা বাতাসে প্রকৃতির যে ঘ্রাণ আসত, তা শুকে শুকে বেড়ে উঠা লিক লিকে খোকাটি একদিন হয়ে  উঠে শত সহস্র মানুষের আদর্শের প্রতিক, শোষিত মানুষের মুক্তির প্রতিক। গ্রাম শহর পেরিয়ে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশ থেকে দেশান্তরে। তিনি হয়ে উঠেন মহাকালের অবিসংবাদিত নেতা। 

১৯২৭ সালে স্থানীয় গিমডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। নয় বছর বয়সে তিনি গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে তৃতয়ি শ্রেণীতে ক্লাশ শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি গোপালঞ্জের মিশনারি স্কুলে ভর্তি হন। কৈশোরে লেখাপড়ার পাশাপাশি ফুটবল খেলার প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ টান। তিনি মাত্র ১২-১৩ বছর বয়সে ৩ বছরের রেণুর  (শেখ ফজিরাতুন্নেছা) সাথে পারিবারিকভাবে বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলেন। তারপর ১৯৪২ সালে তিনি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। একই বছরে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ) ভর্তি হন এবং ১৯৪৬ সালে সেই কলেজে বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নিরীহ মানুষদের জীবন রক্ষা করেন। তিনি ১৯৪৭ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে স্মাতক পরীক্ষায় পাশ করেন। 

দেশ ভাগের পর শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারী পাকিস্তানের প্রথম বিরোধীদলীয় ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। একই বছরের ২৩শে  ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন গণপরিষদে দাড়িঁয়ে ঘোষণা করেন “ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে অবশ্যই রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দুকে মেনে নিতে হবে ”। শেখ মুজিবুর রহমান তাৎক্ষনিক এর প্রতিবাদ করেন। ফলশ্রুতিতে ২রা মার্চ ফজলুল হক মুসলিম হলে ‘সর্ব দলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে ধর্মঘট চলাকালে সচিবালয়ের সামনে থেকে শেখ মুজিবুর রহমানসহ কয়েক জনকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা বিধান ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন সমর্থন করেন। ১৯ শে এপ্রিল চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারীদের পক্ষে মিছিল বের করার সময় তাকে উপাচার্যের বাস ভবনের সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৯ সালের ২৩ শে জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (বর্তমানে আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠা করেন এবং জেলে থাকা অবস্থায় তিনি দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। 

১৯৫২ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী শেখ মুজিবুর রহমান জেলের ভিতরই টানা ১১ দিন আমরণ অনশন করেন। ২১শে ফেব্রুয়ারীতে নিহত শহীদের জন্য শোক ও সমবেদনা জানান। ২৭শে ফেব্রুয়ারী তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের ১০ই মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসনে জয়লাভ করে। এর মধ্যে আওয়ামীলীগ একাই ১৪৩ টি আসনে জয়ী হয়। ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর কাউন্সিল অধিবেশনে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয় যাতে সব ধর্মের মানুষ দলটিতে অংশগ্রহণ করতে পারে। ১৯৫৬ সালে খান আতাউর রহমানের নেতৃত্বে প্রাদেশিক সরকারে শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী হিসাবে যোগ দেন। মাত্র নয় মাস মন্ত্রী ছিলেন। বাঙালীদের স্বাধিকার আন্দোলনকে বেগমান করার জন্য ১৯৫৭ সালের ৩০শে মে তিনি স্বেচ্ছায় মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইস্কান্দর মির্জা ও সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করেন এবং সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করেন। ১১ অক্টোবর তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৪ মাস পর তাকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেলগেটেই গ্রেফতার দেখানো হয়। ১৯৬১ সালে হাইকোর্ট কতৃর্ক আটকাদেশ অবৈধ ঘোষণা করার পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।

১৯৬২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারী শেখ মুজিবুর রহমানকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়। ২রা জুন সামরিক শাসনের অবসান ঘটলে ১৮ জুন তাকে মুক্তি দেয়া হয়। তারপর ২৪ শে সেপ্টেম্বর তিনি লাহোরে যান এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠন করেন। ১৯৬৪ সালের ২৫শে জানুয়ারী অনুষ্ঠিত এক সভায় আওয়ামীলীগকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারী লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর সন্মেলনে ৫ ফেব্রুয়ারী বঙ্গবন্ধু ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ২৩ মার্চ ১৯৬৬ সালে লাহোরে এক সংবাদ সন্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ৬ দফা ঘোষণা করেন। ছয় দফার জন্য ১৯৬৬ সালের ৮ই মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক নেতাকে দেশরক্ষা আইনে সরকার গ্রেফতার করে। ১৯৬৮ সালের ৩রা জানুয়ারী আইয়ুব সরকার বঙ্গবন্ধুকে ১ নম্বর আসামী করে মোট ৩৫জন বাঙালির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। ১৯৬৮ সালের ১৭ই জানুয়ারী বঙ্গবন্ধুকে ছয়দফার জন্য বেকসুর খালাস প্রদান করলেও পরের দিন অর্থাৎ ১৮ই জানুয়ারী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় পুনরায়  তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ১৯ জুন ঢাকা সেনানিবাসে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার কাজ শুরু হয়।  আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং বঙ্গবন্ধুকে মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপি ছাত্র গণ আন্দোলন শুরু হয়। সেই ছাত্র গণ আন্দোলনে নেতৃত্বের অন্যতম ছিলেন তোফায়েল আহমেদ, আ.স.ম. আব্দুর রব ও মতিয়া চৌধুরি সহ অনেকে। ১৯৬৯ সালের ২০ শে জানুয়ারী আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (জন্ম: জুন ১০, ১৯৪২ নরসিংদীর শিবপুরে) যাকে আমরা শহীদ আসাদ নামে চিনি, পুলিশের গুলিতে ঐদিন দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে চাঁনখাঁর পুল এলাকায় মিছিলরত অবস্থায় তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ধীরে ধীরে ছাত্র গণ আন্দোলন আরো বেগবান হতে থাকে। ১৯৬৯ সালের ১৮ই ফেব্রুযারী রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের গেটের সামনে পাকিস্তানি সেনারা নির্মমভাবে অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহাকে হত্যা করে। ১৯৬৯ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারী জনগণের অব্যাহত চাপের মুখে কেন্দ্রীয় সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। তার পরের দিন ২৩ শে ফেব্রুয়ারী রেসকোর্স (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে তোফায়েল আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘ বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ৫ই ডিসেম্বর আওয়ামীলীগের এক জন সভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের নাম রাখেন ‘বাংলাদেশ’। 
১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফার আলোকে তাঁর দলকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহবান জানান। ৭ই ডিসেম্বর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ৩১৩ আসনের মধ্যে ১৬৭টি (পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ২টি পেয়েছিল নুরুল আমিন ও রাজা ত্রিদিব রায়) এবং প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের বিপরীতে ২৮৮টি আসন পেয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগ জয় লাভ করে। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ পাওয়ায় ১৯৭১ সালের ১১ই জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখতে ঢাকায় আসেন। ১৩ই ফেব্রুয়ারী ইয়াহিয়া খান ঘোষনা করেন আগামী ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে। কিন্তু নির্ধারিত অধিবেশন বসার মাত্র দুই দিন আগে ১লা মার্চ ইয়াহিয়া খান ঘোষনা করেন যে, “আগামী ৩রা মার্চ আহুত জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করা হলো”। রেডিওতে এ ঘোষণা শুনার পর সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় ২রা মার্চ ঢাকায় ও ৩-৬ই মার্চ সারাদেশে ধর্মঘট ও অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ সকাল ১১টায় প্রথম লাল সবুজের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন ছাত্রলীগের তৎকালীন নেতা আ স ম আব্দুর রব।  ধর্মঘট শেষে  বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভার ঘোষণা দেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বিকেল ৩টায় রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেন “. . . . . . এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই ভাষণটি ২০১৭ সালের ৩০ শে অক্টোবর জাতিসংঘের  শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক  সংস্থা ইউনেস্কো ‘বিশ^ ঐতিহ্যের দলিল’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে তা সংস্থাটির ‘গবসড়ৎু ড়ভ ঃযব ডড়ৎষফ জবমরংঃবৎ’ এ অন্তভুর্ক্ত করেছে।

এরকম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন এবং ১৬-২৪ মার্চ পর্যন্ত দফায় দফায় আলোচনা চলে। কিন্তু কোন ফলপ্রসু আলোচনা না হওয়ায় ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে ২৫ শে মার্চ রাত ১১টার পর ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে নিরস্ত্র বাঙগালীর উপর অতকির্ত হামলা চালায়। ২৬ শে মার্চ প্রথম প্রহরে তাকে বন্দী করে প্রথমে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ও পরে পাঞ্জাবের মিয়ানওয়ালী কারাগারে আটক করেন। এদিকে ১০ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী  জাতীয় পরিষদের সদস্যদের নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের রাষ্ট্রপতি ও যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন তাজউদ্দিন আহমেদ ও  উপ-রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তবে, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। 
১৯৭১ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে  মন্ত্রীসভার বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য  বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করেন এবং ১২ই জুলাই থেকে সেক্টরগুলো কাজ শুরু করে। দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিকেল ৪.৩১ মিনিটে মিত্রবাহিনীর কাছে ৯১ হাজার সৈন্যসহ পশ্চিম পাকিস্তানের লে. জেনারেল নিয়াজী  মিত্র বাহিনীর পক্ষে জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকারের কাছে আত্মসমপর্ণ করেন। পৃথিবীর বুকে আবির্ভাব হয় লাল সবুজের ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি ভূখন্ডের। 
১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারী আন্তজার্তিক চাপের মুখে পাকিস্তান সরকার স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। বঙ্গবন্ধু ১০ই জানুয়ারী অপরাহ্নে ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনির বিশেষ বিমানযোগে ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসেন। এরপর তিনি যুদ্ধবিধস্ত বাংলাদেশকে পুর্নগঠনে মনোনিবেশ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট তাকে স্বপরিবারে হত্যা করার আগ পর্যন্ত একটি সমৃদ্ধ, শক্তিশালী সোনার বাংলাদেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। 
১৯৭৩ সালের ২৩শে মে বিশ^ শান্তিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে তাকে ‘জুলিও কুরি’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৪ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর বিশ^বাসীর অকুন্ঠ সমথর্ন পেয়ে ১৩৬তম দেশ হিসাবে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে।  ২৪ শে  সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ পরিষদের সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বারের মত বাংলায় বক্তব্য রাখেন। 
শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধু বরাবরই সোচ্চার ছিলেন। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত আনজিয়ার্সের জোট-নিরপেক্ষ সন্মেলনে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট করে বলেছিলেন- বিশ^ আজ দুভাগে বিভক্ত শোষক ও শোষিত। আমি মোষিতের পক্ষে। ১৯৭৩ সালে কিউবার মহান নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন- আমি হিমালয দেখেনি, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি, তাই হিমালয় দেখার সাধ আমার নেই। বঙ্গবন্ধুর ৪৪তম শাহাদৎ বার্ষিকিতে ২০১৯ সালের ১৫ই আগষ্ট জাতিসংঘের সদর দফতরে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন আয়োজিত শোক সভায় জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত আনোয়ারুল করিম চৌধুরি বঙ্গবন্ধুকে ‘বিশ্ববন্ধু’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। বিশ^ ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর মত জাতীয়তাবাদী নেতার দৃষ্টান্ত বিরল। তিনিই একমাত্র নেতা যিনি জাতীয় পুজিঁর আত্মবিকাশের ইচ্ছা ও বাঙালির সন্মিলিত মুক্তির বাসনাকে এক বিন্দুতে মিলাতে পেরেছেন। তাঁর অসামান্য সাহসিকতা ও মহানুভবতা বিশ^বাসীর কাছে বিশেস করে আফ্রিকান ও এশিয়ান মানুষের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর দেখানো পথে হেঁেটই শোষণ ও নিপীড়ন মুক্ত একটি বিশ^ আমরা পাবো। সেজন্যেই বঙ্গবন্ধু বাংলার সীমানা পেরিয়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণী পেশা মানুষের কাছে এই ধরণিতে তিনি আজ বিশ^বন্ধু হিসাবে ধীরে ধীরে পরিচিতি পাচ্ছেন। 

তথ্যসূত্র: 
১। শেখ মুজিবের ছেলেবেলা, বেবী মওদুদ, ১৯৯৪
২। অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান, ২০১২ 
৩। মুজিব শতবর্ষের ইতিহাস, ড. এ. এইচ. এম. মাহবুবুর রহমান, ২০২০
৪। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ, প্রকৌশলী এস এম খাবীরুজ্জামান পি ইঞ্জ, ২০১৩
৫। বাংলা উইকিপিডিয়া www.mujib100.gov.bd
৬। Witness to Surrender, Siddik Salik, UPL 1997.

লেখক:
ড. মাহমুদুল হাছান
সহকারী অধ্যাপক
ফিশারিজ বিভাগ, বশেফমুবিপ্রবি, 
জামালপুর
 

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল