• সোমবার ০৪ মার্চ ২০২৪ ||

  • ফাল্গুন ২০ ১৪৩০

  • || ২২ শা'বান ১৪৪৫

আজকের টাঙ্গাইল

বই আলোচনা : ‘কাজী নজরুলের কারাজীবন’ - মোহাম্মদ রবিন ইসলাম

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ৬ জানুয়ারি ২০২৪  

জামালপুরের সন্তান, বিশিষ্ট গবেষক ও বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা শাহ্ মোহাম্মদ মানরুজ্জামানের পরবর্তী বই ‘কাজী নজরুলের কারাজীবন’ (২০২৩) প্রকাশিত হয়েছে। 

ইতিপূর্বে তিনি জামালপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের (১৯০৫-১৯৮৫) ত্রিকালদর্শী জীবন ও কর্ম নিয়ে দীর্ঘ ছত্রিশ বছর পর  “জীবন-কথা মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার” (২০২২) নামে একটি তথ্যবহুল ও প্রামাণিক গ্রন্থ রচনা করে আমাদেরকে প্রীত করেছেন। ‘কাজী নজরুলের কারাজীবন’ গ্রন্থে তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে বিভিন্ন সময়ে দায়ের হওয়া একাধিক ফৌজদারি মামলা ও একটি দেওয়ানি মামলার বর্ণনা রয়েছে। তন্মধ্যে একটি ফৌজদারি মামলায় তাঁর এক বছরের সশ্রম কারাদÐ হয়েছিল। বস্তুত গণমানুষের মুক্তিসংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের কারণে পৃথিবীতে যে কজন কবি কায়েমি শোষকদের অধীনে কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম তাঁদের অন্যতম। 
ব্রিটিশ আমলে যাঁরা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা কিংবা মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছেন, তাঁদের কারাবরণ করা ছিল প্রায় অবধারিত। কাজী নজরুল ইসলাম স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখতেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যতগুলো পন্থা অবলম্বন করা প্রয়োজন- তিনি তা করেছিলেন। তিনি একজন রাজনৈতিক দলের সদস্য, নির্ভীক সাংবাদিক ও কবি হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। ভারত উপমহাদেশে কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি লিখিত দলিলের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করেছিলেন। ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা লাভের জন্য জাতিকে তিনি সংগ্রামের পথে আহবান করেন। সমকালে স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ। এর ফলে ব্রিটিশ-ভারত সরকার তাঁকে বিচারের নামে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে কারাগারে নিক্ষেপ করে। এই গ্রন্থে কাজী নজরুলের কারাজীবনের ঘটনাবলি ছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের কৃত ফৌজদারি মামলার আদালতে শুনানির ঘটনাবলির সমসাময়িক পত্রপত্রিকার নানা তথ্য ও উপাত্ত রয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও কর্ম অনুধাবনে যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।
স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার সম্পাদক। এ পত্রিকায় ১৯২২ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বরের ১২শ সংখ্যায় তাঁর লেখা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ৭৯ লাইনের একটি দীর্ঘ প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক কবিতা  ও ১৯২২ সালের ২০শে অক্টোবরের ১৫শ সংখ্যায় ১১ বছরের ছোট মেয়ে শ্রীলীলা মিত্রের ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’ প্রকাশিত হলে ব্রিটিশ রাজ সরকারের রাজ মর্যাদাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার এ সংখ্যা দুটি বাজেয়াপ্তসহ পত্রিকার সম্পাদক কাজী নজরুলের বিরুদ্ধে তৎকালে প্রচলিত ভারতীয় দন্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১২৪ক ধারায় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হয়। এ ধরনের মামলা করার জন্য সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রেও তদানীন্তন ভারতের ভাইসরয় অথবা গভর্নর জেনারেলের দপ্তর কিংবা বাংলা সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে এই মামলা করা হয়েছিল।
এই মামলার সঠিক নাম পাওয়া না গেলেও মামলাটি ‘ধূমকেতু’র মামলা কিংবা `The Emperor Vs Kazi Nazrul Islam’ নামে পরিচিতি। ভারতবর্ষে সেই সময়ে  ইংল্যান্ডের রাজার নামে শাসন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেই হিসেবে মামলার ফরিয়াদি ছিলেন স্বয়ং রাষ্ট্র বা রাজা। ‘ধূমকেতু’র মামলায় ১৯২৩ সালের ১৬ই জানুয়ারি কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট মি. সুইন হো রায় প্রদান করেন। এই রায়ে কাজী নজরুলের এক বছরের সশ্রম কারাদন্ডাদেশ হয়। 
তিনি জেলে নানা নির্যাতন-জুলুমের শিকার হয়েছিলেন। জেলে তাঁকে বিপজ্জনক বন্দি হিসেবে নির্জন কারাবাসের (solitary imprisonment) শাস্তি পেতে হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই-রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে দূরে রাখা। কিন্তু তা হয়নি-বরং উল্টো হয়েছে। আন্দোলন আরও চাঙ্গা হয়েছিল। জেলজীবনের মধ্যে তিনি আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। সারা ভারতবর্ষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। ভারতবর্ষব্যাপী তাঁর পরিচিতি তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতাকামীদের কাছে তিনি জাতীয়তাবাদী কবি হিসেবে দ্রæত খ্যাতি লাভ করেন।
তিনি কারাজীবনের দিনগুলি প্রেসিডেন্সি জেল, আলিপুর জেল, হুগলি জেল ও বহরমপুর জেলে অতিবাহিত করেন। হুগলি জেলে সাধারণ কয়েদি হিসেবে অনশনব্রত থাকাকালে তাঁর জীবন সংশয় হয়েছিল। এ গ্রন্থে কাজী নজরুলের কারাজীবনের দুঃসহ জীবনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া সমকালীন বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী ও গবেষক এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের লেখায় কাজী নজরুলের জেলজীবনের নিপুণ বর্ণনা উঠে এসেছে। কাজী নজরুল ইসলামের কারাজীবনের ওপর এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। কবি নজরুলের কারাজীবনের অনেক প্রাসঙ্গিক বিষয় এ গ্রন্থ থেকে জানতে পারা যাবে। কারাবাসের সময় কাজী নজরুল ইসলাম অনেক গান ও কবিতা রচনা করেছেন। সেসবের আলোচনা এ গ্রন্থে রয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৩০ সালের ২৫শে অক্টোবর ‘প্রলয়-শিখা’ গ্রন্থের জন্য কাজী নজরুলের বিরুদ্ধে আরও একটি ফৌজদারি মামলা হয়েছিল। এই মামলায় তাঁর ছয় মাসের কারাদন্ড  হয়। কিন্তু দ্বিতীয়বার তাঁকে জেলে যেতে হয়নি। মহাত্ম্ গান্ধী ও লর্ড আরউইনের মধ্যে রাজনৈতিক চুক্তির (১৯৩১ সালের ৫ই মার্চ) কারণে ও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার দরুন তিনি কারাবাস থেকে রেহাই পেয়েছিলেন।


‘কাজী নজরুলের কারাজীবন’ গ্রন্থখানা বিজয় প্রকাশ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন সুশীল রায়, নামপত্র অলংকরণ করেছেন আবিদ করিম মুন্না, পৃষ্ঠা ১৫২, মূল্য : ৩০০ টাকা। গ্রন্থটির সূচিতে ছোট বড় ৩৮টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত। বিভক্ত অংশগুলো হলো জুভেনাইল কোর্টে কিশোর কবি কাজী নজরুল, কারাজীবন সম্পর্কে কাজী নজরুলের স্মৃতি, কাজী নজরুলের গ্রেফতার, মামলার শুনানি, কারাজীবন, মুক্তির পূর্বে কারা আইন, ১৮৮৪-এর ৪২ ধারায় মামলা, কাজী নজরুলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগের বিচার ও দÐ, ‘ধূমকেত’ুর মামলার আপিল প্রসঙ্গে, দÐবিধির ১২৪ক  ও জেল কোডের ৪২ ধারা, জেল আইন, ১৮৯৪, মামলা ও কারাজীবন সম্পর্কে চিঠিপত্র ও সমকালীন পত্রপত্রিকার সংবাদ, কারামুক্তির পরবর্তী দিনগুলো, প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে কারাজীবনের বর্ণনা : নলিনী কান্ত সরকার, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিরজাসুন্দরী দেবী, কাজী আবদুর রহীম, নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী, গবেষক ও সুধিজনদের লেখায় কারাজীবনের বর্ণনা : মুজফ্ফর আহ্মদ, রফিকুল ইসলাম, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, আজহারউদ্দীন খান, অরুণকুমার বসু, প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়, ‘ধূমকেতু’র মামলা, নবযুগ মামলা, কাজী নজরুলের বিরুদ্ধে ইস্টার্ন ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেডের দেওয়ানি মামলা, কাজী নজরুলের কারাসাহিত্য, রাজবন্দীর জবানবন্দী, আনন্দময়ীর আগমনে, বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ , পরিশিষ্ট ১. বিভিন্ন কারাগারে কাজী নজরুলের অবস্থানের তারিখ ও কারাগারের নাম, পরিশিষ্ট ২. ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় কাজী নজরুলের প্রকাশিত লেখা ও সম্পাদকীয় রচনার কালানুক্রমিক তালিকা, সম্পাদক/সারথি ও মুদ্রক-প্রকাশকের নাম এবং অফিস ঠিকানা।
‘কাজী নজরুলের কারাজীবন’ নিয়ে এ ধরনের গ্রন্থ সম্ভবত এই প্রথম। এ গ্রন্থ লিখতে গিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কাজী নজরুল ইসলামের মৌলিক গ্রন্থ ও তাঁর ওপর প্রণীত অসংখ্য গ্রন্থ পাঠ করেছেন মর্মে লেখক ভ‚মিকা অংশে জানিয়েছেন। গ্রন্থাকারের আইনবিষয়ে পড়াশোনা থাকায় তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা করেছেন। তবে আরো বিশদভাবে লিখলে ভালো হতো। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কারাজীবনকে জানতে হলে এই বই পড়তে হবে।
 লেখক : গবেষক ও শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, প্রথম বর্ষ, ঢাকা কলেজ।

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল