• সোমবার ০৪ মার্চ ২০২৪ ||

  • ফাল্গুন ২০ ১৪৩০

  • || ২২ শা'বান ১৪৪৫

আজকের টাঙ্গাইল

চার বছরে শর্ষের আবাদ বেড়েছে ৪৯ হাজার হেক্টর জমিতে

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ২০ জানুয়ারি ২০২৪  

দিগন্তজোড়া হলুদ ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে মাঠ। মাঘের হিমশীতল বাতাস আর সূর্যের লুকোচুরি আলোতে হাসছে কৃষকের স্বপ্ন। কৃষি খাতে উত্তরাঞ্চলের রংপুর কৃষি অঞ্চলে তেল ফসল সরিষা আবাদে কৃষকরা শুভবার্তা বহন করছেন। কৃষিবান্ধব শেখ হাসিনা সরকারের কৃষি উপকরণের প্রণোদনা কর্মসূচির সহযোগিতায় এ অঞ্চলে গত চার মৌসুমে সরিষা আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৯ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে। 
জানা গেছে, চলতি রবি মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম জেলায় ২৬ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে, যা রংপুর অঞ্চলের সর্বোচ্চ। এ ছাড়া রংপুর জেলায় ২৫ হাজার ৪৫০ হেক্টর, গাইবান্ধা জেলায় ১৭ হাজার ৫৭৪ হেক্টর, নীলফামারী জেলায় ৮ হাজার ৬৭২ হেক্টর ও লালমনিরহাট জেলায় ৪ হাজার ৮৮০ হেক্টর  জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এবার চলতি মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলে পাঁচ জেলায় সরিষা আবাদ হয়েছে ৮৩ হাজার ১৬১ হেক্টর জমিতে। নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলায় ২০২২-২০২৩ মৌসুমে সরিষা আবাদ হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে। গতবারের তুলনায় এবার ৩০ হাজার ৬০৯ হেক্টর বেশি জমিতে সরিষা আবাদ করেছে চাষিরা। ২০২১-২০২২ মৌসুমে সরিষা আবাদ হয়েছিল ৩৯ হাজার ২৯০ হেক্টরে ও ২০২০-২০২১ মৌসুমে সরিষা আবাদ হয় ৩৩ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমিতে। বিগত চার মৌসুমের হিসাবে দেখা যায় এ অঞ্চলের ৫ জেলায় সরিষা আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৯ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে। আর সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৩৬ মেট্রিক টন।
এদিকে নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচরের কোলঘেঁষা মেঠোপথ আর চরাঞ্চলের কৃষিতে দোল খাচ্ছে সরিষা। দিগন্তজোড়া হলুদ ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে মাঠ। দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টন। এর মধ্যে সরিষা, তিল ও সূর্যমুখী হতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় মাত্র ৩ লাখ টন, যা চাহিদার শতকরা ১২ ভাগ। বাকি ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়। তেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে সরিষা চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সরিষা চাষে কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়ার কারণে গত ৪ বছরে আবাদ বেড়েছে বহুগুণ। অন্য ফসলের চেয়ে সরিষা উৎপাদনে খরচ অনেক কম, লাভ বেশি হওয়ায় সরিষা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। এ কারণে প্রতি বছর উত্তরাঞ্চলে সরিষা চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা। এ বছর সরিষার ফলনও হয়েছে বা¤পার। 
সরিষা বাংলাদেশের প্রধান ভোজ্যতেল ফসল। বিভিন্ন সরিষার বীজে প্রায় ৪০-৪৪ শতাংশ তেল থাকে। সরিষার তেলের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণ। সরিষার খৈলেও প্রায় ৪০ শতাংশ আমিষ থাকে। সরিষার খৈল গরু ও মহিষের পুষ্টিকর খাবার। সরিষার গাছ আবার জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। এসব কারণে বিশেষজ্ঞগণ সরিষার চাষ বৃদ্ধি করার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছেন।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় রবি মৌসুমে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪৭০ জন কৃষককে বীজ ও সার প্রণোদনা দিয়ে আসছে। ১০টি শস্য আবাদের জন্য এ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গম, ভুট্টা, সরিষা, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, সয়াবিন, পেঁয়াজ, মুগ, মসুর ও খেসারির ডালের আবাদ বৃদ্ধিতে এই বীজ এবং সার বিনামূল্যে কৃষকদের দেওয়া হয়। ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ জন কৃষকের মধ্যে নীলফামারী জেলায় প্রণোদনা পেয়েছে ২২ হাজার ৪৪০ জন কৃষক, লালমনিরহাটে  ২৬ হাজার ৯০০ জন, রংপুর জেলায় ৪০ হাজার ১১০ জন, গাইবান্ধায় ৩৮ হাজার ২০০ জন, কুড়িগ্রামে ৪৮ হাজার ৮২০ জন কৃষক। এক সময়ের মঙ্গা ও অভাবী এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগ। ১৫ বছর আগের সেই দিন এখন আর নেই। কোনো জমি আর পতিত হিসেবে পড়ে থাকে না, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। কৃষি বিভাগের মতে, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমি সরিষা চাষের জন্য বড়ই উপযোগী। পরিকল্পিতভাবে এই সরিষা চাষ করতে পারলে উত্তরাঞ্চল থেকেই দেশের অর্ধেকেরও বেশি সরিষার তেলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। 
সূত্র মতে, এক সময় তেল ফসল বিশেষ করে সরিষার কাক্সিক্ষত ফলন পায়নি কৃষক। বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম এক ব-দ্বীপ যার চারিপাশ ঘিরে রয়েছে নদ-নদী, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড়, পুকুর-দীঘি, আর এই পানির আধিক্যের কারণেই এক সময় জমিতে সঠিকভাবে ফসল ফলানো যায়নি। অন্যদিকে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, শিলাবৃষ্টি প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল একটি নিয়মিত ব্যাপার। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে এ দেশের খাদ্য উৎপাদন ছিল মাত্র এক কোটি টন। এই খাদ্যের জোগান আসত রবি ফসল, স্থানীয় জাতের আউশ ও আমন ফসল থেকে। বন্যার কারণে কৃষক অধিকাংশ সময়ে আউশ ও আমন ফসল ঘরে তুলতে পারত না, আবার খরার কারণেও ঘরে উঠত না নতুন ফসল। কালের আবর্তে পুরো প্রকৃতিনির্ভর এই কৃষিতে স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশে শুরু হয় সবুজ বিপ্লবের। বর্তমান বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃষিবান্ধব সরকারের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় দেশ আজ শুধু খাদ্যে স্বয়ংস¤পূর্ণই নয়, বরং খাদ্যে উদ্বৃত্ত এক নতুন বাংলাদেশ। 
এ অঞ্চলের সরিষা চাষিদের মতে, গত ৩ বছর আশানুরূপ দাম পাওয়ায় এবং কৃষি বিভাগ সরিষা চাষে প্রণোদনা দেওয়ায় কৃষক সরিষা চাষে আগ্রহী হয়েছেন। গত বছর ৩ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছিলেন নীলফামারী সড়র উপজেলার সোনারায় গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক। বিঘা প্রতি তার খরচ হয়েছিল ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। ফলন পেয়েছিলেন ১৭ মণ। প্রতি মণ সরিষা ৩ হাজার দরে ৫১ হাজার টাকায় বিক্রি করেছিলেন।
আব্দুল মালেক  বলেন, ‘গত বছর সরিষা চাষে আশানুরূপ লাভ হওয়ায় এবার ৭ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করছি। আশা করছি, এবারও ভালো ফলন ও ভালো দাম পাব।’ মালেক জানান, আগে অনেক কৃষক সরিষা চাষ করতেন। আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় তারা চাষ কমিয়ে দিয়েছিলেন। ‘বাজার দর ৩ হাজার টাকার বেশি থাকলে কৃষকরা সরিষা চাষে আরও বেশি উৎসাহী হবেন,’ বলেন তিনি।
ডোমার উপজেলার খাটুরিয়া গ্রামের কৃষক নরেশ চন্দ্র  বলেন, ‘গেল বছর ৪ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছিলাম। এ বছর ১০ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছি। কৃষি বিভাগ থেকে বীজ ও সার প্রণোদনা দিয়েছে। গেল বছর সরিষার ফলন ভালো ছিল, দামও ভালো পেয়েছি।’ এবার প্রতি বিঘা জমিতে ৬ থেকে ৭ মণ সরিষা পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি। নরেশ আরও বলেন, ‘গত বছর সরিষার পরে বোরো লাগানোর কারণে ধানের ফলনও ভালো হয়েছিল।’
লালমনিরহাট সদর উপজেলার ভাটিবাড়ী এলাকার কৃষক মনিন্দ্র নাথ বর্মণ বলেন, ‘দাম পাওয়া যায় না বলে সরিষা চাষ ছেড়ে দিয়েছিলাম। গত বছর ১ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছিলাম, দাম ভালো পেয়েছি। তাই এবার ৬ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করছি।’ ‘সরিষার বাজার দর এ রকম থাকলে আমরা আবারও সরিষা চাষে ফিরব,’ বলেন তিনি। লালমনিরহাট শহরে সরিষা বিক্রেতা আলমগীর হোসেন বলেন, গত বছর সরিষার ব্যাপক চাহিদা ছিল। আমরা প্রতি মণ সরিষা ৩ হাজার টাকা থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে কিনেছিলাম। এ বছরও সরিষার চাহিদা আছে।
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. এস এম আবু বকর সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষকদের সরিষা চাষে ফিরিয়ে আনতে বিগত কয়েক বছরের ন্যায় এ বছরও তাদের বীজ ও সার প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। গেল বছর সরিষার আশানুরূপ ফলন ও দাম পাওয়ায় কৃষকরা উৎসাহী হয়েছেন। সরিষা চাষ কৃষির জন্য শুভ বার্তা। যারা সরিষা চাষ করছেন আমরা তাদের সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি।’ এরই মধ্যে চাষকৃত সরিষার বেশিরভাগেই দানা ও ফুল এসেছে। তিনি জানান, ‘সরিষা চাষ একদিকে যেমন মাটির উর্বরতা বাড়ায়, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরিষা ৩ মাস মেয়াদি ফসল। কৃষক কম খরচ ও কম পরিশ্রমে সরিষা চাষ করতে পারেন। বর্তমানে সরিষা চাষ কৃষকের কাছে লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে।’

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল