• বুধবার ২৪ এপ্রিল ২০২৪ ||

  • বৈশাখ ১১ ১৪৩১

  • || ১৪ শাওয়াল ১৪৪৫

আজকের টাঙ্গাইল

চেরাগ থাকলেও নেই পাহাড়, নাম তার ‘চেরাগী পাহাড়’

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ১০ মার্চ ২০২৩  

চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক স্থানগুলোর একটি চেরাগী পাহাড়। পাহাড়টির ওপর প্রথম চেরাগ জ্বালান বদর শাহ নামে এক পীর। চেরাগ জ্বালিয়ে তিনি দৈত্যদানব ভরা এ শহর থেকে দূর করেন অশুভ আত্মা। এরপর থেকে এ পাহাড়ের নাম হয় চেরাগী পাহাড়।
নামে চেরাগী পাহাড় হলেও বর্তমানে এখানে পাহাড়ের কোনো ছিটেফোঁটা নেই। আছে কৃত্রিমভাবে বানানো একটি চেরাগ। আর চারপাশে গড়ে উঠেছে সারি সারি দালান। শুধু চেরাগী পাহাড়ই নয়, চট্টগ্রামের আরো এমন অনেক স্থানের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে পাহাড় শব্দটি।

চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চেরাগী পাহাড়ের প্রাচীন ইতিহাস। যা এখন অনেকটা হারানোর পথে। সাংবাদিক ও চিকিৎসকপাড়া হিসেবে পরিচিত এ চেরাগী পাহাড়ের গৌরবগাঁথা সেই ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এর রূপ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন অনেকে।

কথিত আছে, অতীতে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আরব দেশ থেকে ভাসমান একখণ্ড পাথরের ওপর আরোহণ করে পূর্ব দেশে রওনা হন সুফি সাধক বদর শাহ। সেই পাথরখণ্ডটি নিয়ে একদিন তিনি কর্ণফুলী নদীতে প্রবেশ করেন। প্রবেশের পর যে স্থানে তিনি পাথরটি থেকে নামেন, সেই স্থানটির নামকরণ হয় ‘পাথরঘাটা’। তখন পুরো চট্টগ্রাম শহর ছিল জনমানবহীন গভীর অরণ্যে আবৃত। ছিল জিন-পরীর আবাসস্থল। পাথরখণ্ড থেকে নেমে তীরে উঠে আসেন বদর শাহ। মাটির চেরাগ হাতে নিয়ে গভীর বন-জঙ্গলের মধ্য দিয়ে একটি পাহাড়ের ওপর উঠতে যাচ্ছিলেন তিনি। সে সময় তাকে বাধা দেয় জিন-পরীরা।

পথ আটকে তারা তাকে বলে, কে আপনি আমাদের মুল্লুকে অনধিকার ঢুকেছেন? এখানে কোনো মানুষের স্থান হবে না। বদর শাহ তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমি একজন সংসারবিরাগী বৃদ্ধ। আল্লাহর এবাদত-বন্দেগী করার মানসে এখানে এসেছি। আমাকে এখানে থাকার স্থান দাও। কিন্তু জিন-পরীরা কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। এভাবে কথা কাটাকাটি চলতে চলতে দিন গড়িয়ে রাত নেমে আসে।

রাতের অন্ধকারে চেরাগটি রেখে জ্বালানোর স্থানটুকু চান বদর শাহ। এতে জিন-পরীরা রাজি হয়। এরপর চেরাগটি পাহাড়ের ওপর রেখে নিজের পকেট থেকে দুটি চকমকি পাথর বের করেন বদর শাহ। পাথর দুটির ঘর্ষণে আগুন বের করে চেরাগটি জ্বালিয়ে দেন।

দেখতে দেখতে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছিল চেরাগের আলো। সে আলো এমন তীব্র তেজ বিকিরণ করতে থাকে যে, সব জিন-পরীরা জ্বালা-যন্ত্রণায় ছটফট করতে শুরু করে। কিন্তু তারা এর কোনো প্রতিবাদ বা প্রতিকার করতে পারল না। কারণ তারাই বদর শাহকে চেরাগ রাখার স্থান দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত চেরাগের সেই অলৌকিক আলো সহ্য করতে না পেরে চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে যায় জিন-পরীরা। এরপর আবাদ হয় চট্টগ্রাম। বদর শাহর চেরাগ রাখা সেই পাহাড়ের নাম হয় ‘চেরাগী পাহাড়’।

ঐতিহাসিক যুগের প্রারম্ভকাল থেকে প্রায় হাজার বছর কাল আরাকান অধিকারভুক্ত ছিল চট্টগ্রাম। ফলে চট্টগ্রামের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতিতে আরাকানি প্রভাব বেশ পরিলক্ষিত হয়।

রেডিও বাংলাদেশ চট্টগ্রামের পাহাড়িকা অনুষ্ঠানের তৎকালীন সহকারী উপ-প্রযোজক আরাকানি ভাষী উ-চ-নু ও মং উসাংয়ের মতে, চেরাগী পাহাড় নামটি আরাকানি নামের অপভ্রংশ। আরাকানি ভাষায় এর নাম ‘চারেগ্রীটং’। ‘চারেগ্রী’ ও ‘টং’ দুটি শব্দ যুক্ত হয়ে ‘চারেগ্রীটং’ নামের উৎপত্তি। এখানে ‘চারেগ্রী’ শব্দের অর্থ প্রধান হিসাবরক্ষক ও ‘টং’ অর্থ পাহাড়। দুটি মিলে হয় প্রধান হিসাবরক্ষকের পাহাড়।

আরাকানি শাসনামলে সম্ভবত চট্টগ্রামের এ পাহাড়েই ছিল তাদের প্রধান হিসাবরক্ষক কিংবা দেওয়ানের চারেগ্রীর বাসস্থান। ফলে পাহাড়টিকে চারেগ্রী পাহাড় নামে খ্যাত করে চট্টগ্রামের অধিবাসীরা। কালক্রমে নামটি অপভ্রংশ হয়ে চেরাগ্রী পাহাড় ও পরে চেরাগী পাহাড় হিসেবে খ্যাত হয়।

চট্টগ্রামে মুসলমানদের বিজয়ের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁর সুলতান ফকরউদ্দিন মুবারক শাহর আমলে আরাকানিদের বিতাড়িত করে সোনারগাঁর মুসলমান রাজ্যভুক্ত হয় চট্টগ্রাম।

১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর পরিব্রাজক ইবনে বতুতা চট্টগ্রামে আসেন। তিনি তার ভ্রমণকাহিনিতে সুলতান অধিকৃত চট্টগ্রামের শাসনকর্তা শায়েদা সুলতানের ছেলেকে হত্যার ঘটনা লিপিবদ্ধ করলেও বদর শাহর অলৌকিক আলোতে জিন-পরী বিতাড়িত করে চট্টগ্রাম বিজয়ের কথা লিখেননি।

১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে কবি মোহাম্মদ খাঁ বিরচিত মক্তুল হোসেন কাব্যেও আত্মকথার পিতৃকুল পরিচিতিতে বর্ণনা করেছেন, মগদের বিতাড়িত করে চট্টগ্রাম জয় করেন সেনাপতি কদল খান গাজী। এতে কদল খান গাজীকে সহায়তা করেন বদর শাহ। কিন্তু বদর শাহর অলৌকিক আলোতে জিন-পরী বিতাড়িত করার কথা তিনিও লিখেননি। ফলে অনেকের মতে, বদর শাহর অলৌকিক চেরাগ ও জিন-পরী বিতাড়িত করার ঘটনা একটি আষাঢ়ে গল্প।

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল