• শুক্রবার ৩১ মে ২০২৪ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১৬ ১৪৩১

  • || ২২ জ্বিলকদ ১৪৪৫

আজকের টাঙ্গাইল

দৈনিক ইত্তেফাক ও সাংবাদিকতার দায়

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ২৩ ডিসেম্বর ২০২২  

ইত্তেফাক ৭০ বছরে পা রাখল। বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এটা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। শুধু সংবাদপত্রই নয়, বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের পথেও ইত্তেফাকের এই পথচলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই ইতিহাসবিদরা বলে এসেছেন। কেননা, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পেছনে একেকটি আন্দোলন পেরিয়ে আসার যে অধ্যায়, তার প্রতিটি পর্যায়ে ইত্তেফাক নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও বাঁক বদলে ইত্তেফাক অতন্ত্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থেকে দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সেই দিকনির্দেশনা ছিল রাজনীতিকদের প্রতি, জনগণের প্রতি। সেই নির্দেশনায় ছিল গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্য অর্জনের রূপরেখা। সেই নির্দেশনাকে অবলম্বন করেই বাংলাদেশের মানুষ, রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে আন্দোলন গড়ে তুলেছে।

তাই আমরা বিনয়ের সঙ্গেই বলি, ইত্তেফাক ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথ ছিল এক। ইত্তেফাকের যাত্রা আর স্বাধীন বাংলাদেশের অভিযাত্রা ছিল অভিন্ন। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের নিরন্তর প্রেরণার উৎস। প্রধানত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মানিক মিয়া ও দৈনিক ইত্তেফাক—এই তিনের সংকল্প এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের পথ সৃষ্টি করেছিল। তারই পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। সে কারণেই এটাও অনস্বীকার্য যে, দৈনিক ইত্তেফাক আর এই সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন সমার্থক। বস্তুত তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার গণতন্ত্রের প্রতি অনমনীয় অবস্থান, ক্ষুরধার লেখনি দৈনিক ইত্তেফাকের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের ৫১ বছর পেরিয়ে এসেছি আমরা। দেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষ স্বাধীনতার যে স্বপ্ন হৃদয়ে লালন করেছে, সে লক্ষ্য আমরা এখনো পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি। দেশের নানামুখী উন্নয়ন হচ্ছে। দেশ দরিদ্র রাষ্ট্রের কাতার থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের দিকে পথ চলতে শুরু করেছে; কিন্তু এখনো আমরা উল্লেখযোগ্য মানুষের জীবন থেকে দারিদ্র্য দূর করতে পারিনি। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা আজও সম্ভব হয়নি। পাকিস্তান আমলে যে বঞ্চনার জন্য মানুষ আন্দোলন করেছে, আত্মাহুতি দিয়েছে সেই বঞ্চনা থেকে মানুষকে আজও মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানের চেয়ে আমরা অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি সাধন করলেও স্বাধীন বাংলাদেশকে যে পর্যায়ে উন্নীত করার স্বপ্ন আমরা সবাই মিলে দেখেছিলাম তা অর্জিত হয়নি। সম্পদের মালিকানা অল্পকিছু মানুষের হাতে। সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। বকস্বাধীনতা, মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আজও অর্জন করা সম্ভব হয়নি বলেই মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য আজও অর্জিত হয়নি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। এই বৈষম্য যতদিন থাকবে, ততদিন সংবাদপত্রের দায়িত্ব রয়ে যায়। ইত্তেফাক সেই লক্ষ্য অর্জনে সব সময় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছে। যতদিন পর্যন্ত দেশের মানুষ পূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ না পাবে, ততদিন পর্যন্ত ইত্তেফাক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গণমুখী সাংবাদিকতার দায়ভার বহন করে যাবে।


মুক্তিযুদ্ধের পর সময়ের বাস্তবতায় ইত্তেফাকের বিন্যাসে পরিবর্তন এসেছে। বদলেছে তার আঙ্গিক, ভাষা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে তাদের সাংবাদিকতা অগ্রসর হতে থাকে। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকতায় বিবর্তন এসেছে। সময়ের দাবি মেটাতে ইত্তেফাকের বিন্যাসে অনেক পরিবর্তন এসেছে; কিন্তু সত্য, ন্যায়, গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের প্রশ্নে ইত্তেফাকের অবস্থান প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনো বদলায়নি। বদলাবেও না।

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী এ সংবাদপত্রের শুভ মুহূর্তে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি জানাই অশেষ কৃতজ্ঞতা, শুভেচ্ছা। আপনাদের সীমাহীন ভালোবাসাই দৈনিক ইত্তেফাককে দীর্ঘ পথচলায় প্রেরণা জুগিয়েছে। সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে সময়ের দাবি মেটানো। সেই দিক থেকে দৈনিক ইত্তেফাক তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সময়ের দাবি মিটিয়ে এসেছে। যাদের ত্যাগ, পরামর্শ ও ভালোবাসায় দৈনিক ইত্তেফাক কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে এসেছে, তাদের আজ আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। দৈনিক ইত্তেফাক গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে। এদের সীমাহীন প্রেরণা, ভালোবাসা ও ত্যাগের বিনিময়ে দৈনিক ইত্তেফাক আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে। একই সঙ্গে স্মরণ করছে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের শহিদদের। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বীরদের।

ইতিহাসবিদরা বলেন, শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে গণমুখী সাংবাদিকতার মিলিত শক্তিই দেশকে স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করার প্রেরণা জুগিয়েছে। ইতিহাসের বিশ্লেষণে দেখা যায়, শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে তা সংবাদপত্রসহ রাষ্ট্রের অন্য ভিত্তিসমূহকেও শক্তি জোগায়।

বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে দৈনিক ইত্তেফাক এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে। একসময়ে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের সামরিক শাসক দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। সে সময়ে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আপস করলে মানিক মিয়া ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে পারতেন; কিন্তু তিনি এবং তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ সাংবাদিক শ্রেণি জনমানুষের সংবাদপত্রের প্রতি যে বিশ্বাস তার সঙ্গে আপস করেননি। তিন বছর পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ রেখেছিলেন। পত্রিকার সাংবাদিকরাও অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছিলেন; কিন্তু কেউই মাথা নোয়াননি। মানিক মিয়ার আদর্শের প্রতি প্রত্যেকে সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নির্ভীক সাংবাদিকতার যে উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করে গেছেন তা এক বিরল দৃষ্টান্ত।

বাঙালির অধিকার রক্ষায় পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে বারবার কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়; এমনকি হুমকি ও লোভলালসা দেখিয়েও লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। শুধু তাই নয়, মহান মুক্তিযুদ্ধে ২৫ মার্চ রাতে দৈনিক ইত্তেফাক ভবন পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা অন্যান্য স্থাপনার সঙ্গে দৈনিক ইত্তেফাককেও নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল; কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় বারবার প্রবল প্রতাপে ফিরে এসেছে দৈনিক ইত্তেফাক।

মানিক মিয়ার মানস দর্পণ ছিল যেন ইত্তেফাকের প্রতিটি পৃষ্ঠা। নীতির প্রশ্নে, বাংলার মানুষের অধিকারের বিষয়ে তিনি কখনো আপস করেননি। দৈনিক ইত্তেফাক ছিল তার সেই সংগ্রামী জীবনের প্রধান হাতিয়ার। গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ এ ব্যক্তিত্ব দেশের সাংবাদিকতাকে একটানে বদলে দিয়েছিলেন। মানুষের প্রত্যাশা, বেদনাকে জোরালোভাবে তুলে ধরার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার। দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে অবলম্বন করে জীবনব্যাপী তিনি এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’, ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ আর ‘রঙ্গমঞ্চ’ শিরোনামে কলাম লিখে বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতাকামী করে তোলেন মানিক মিয়া। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের কথা সহজ ভাষায় তিনি মানুষের সামনে তুলে ধরেন।

‘মোসাফির’ শিরোনামে তার ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলামে নির্ভীক সত্য ভাষণ, অনন্য রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং গণমানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই বাংলার মানুষের হৃদয়ে তিনি অবিনশ্বর হয়ে রয়েছেন। মানিক মিয়া প্রচলিত অর্থে শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না। বরং সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের মুক্তির পথ রচনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার আপসহীন মনোভাবের কারণে প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানি শাসকরা বারবার তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের ওপর বারবার নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়।

বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন তো বটেই, সেই ১৯৫৪ সাল থেকেই দৈনিক ইত্তেফাক বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্রের পক্ষে জনগণকে সচেতন করতে সচেষ্ট থেকেছে। এরপরে ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলন—সবকিছুতেই দৈনিক ইত্তেফাক সাংবাদিকতাকে অবলম্বন করে সামনে রাজনীতির পথনির্দেশ করেছে। বাংলার মানুষ দৈনিক ইত্তেফাক পড়ে দেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে অবগত হতেন।

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল