• শুক্রবার   ১৪ মে ২০২১ ||

  • বৈশাখ ৩১ ১৪২৮

  • || ০২ শাওয়াল ১৪৪২

আজকের টাঙ্গাইল

শেখ হাসিনার সাহসই আমাদের ভরসার প্রতীক: তাপস হালদার

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০২০  

মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন দুর্যোগ আর কখনো আসেনি, এটিকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধও বলা যেতে পারে। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শত্রু চিহ্নিত ছিল, আর এই বিশ্বযুদ্ধের শত্রু অজানা। আগেও এই পৃথিবীতে অনেক মহামারি হয়েছে, অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত ও মারা গেছে। কিন্তু কোভিড-১৯ এর মতো এত ব্যাপকতা কখনো ছিল না। পৃথিবীর সকল দেশ-অঞ্চল একসাথে এমনভাবে আর কখনো আক্রান্ত হয়নি। বিশ্বজুড়ে ধনী-গরিব, দুর্বল-শক্তিশালী কোনো রাষ্ট্রই আক্রমণের হাত থেকে বাদ যাচ্ছে না।

 

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শতবছর পরপর এ ধরনের একটি মহামারি পৃথিবীর যেকোনো একটি অঞ্চলে আঘাত করেছে। তবে এবারই প্রথম কোভিড-১৯ সমগ্র পৃথিবীতে আঘাত করলো। পৃথিবীর মানব সভ্যতা আজ বিপর্যস্ত। এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক তৈরি হয়নি। একমাত্র সামাজিক দূরত্ব বা সঙ্গনিরোধই প্রতিরোধক হিসেবে বলা হচ্ছে। এই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। কোনো কোনো দেশ পুরোপুরি লকডাউন করেছে, কোনো দেশ কারফিউ জারি করছে। ফিলিপাইন ও নাইজেরিয়ায় দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছে, আমাদের বাংলাদেশে মধ্যপন্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বুঝিয়ে-শুনিয়ে ঘরে রাখার জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে আর কাউকে কাউকে জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। যার সুফল আস্তে আস্তে সকলকে ঘরে নেয়া সম্ভব হচ্ছে।

 

বাংলাদেশের মূলশক্তি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার সাহস ও দৃঢ় নেতৃত্ব। যেভাবেই বলি না কেন বাংলাদেশের একজন মানুষকেই সাধারণ জনগণ বিশ্বাস করে তার নাম শেখ হাসিনা। জনগণ বিশ্বাস করে জননেত্রী শেখ হাসিনা তাদের সাথে প্রতারণা করে না, তাদের সাথে মিথ্যা কথা বলে না। তিনিই একমাত্র নেতা যিনি জনগণকে ভালোবাসেন, জনগণের মঙ্গলের জন্য কাজ করেন। সে জন্যই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যখন ভরসা দেন, জনগণ সেটা বিশ্বাস করে। জননেত্রী শেখ হাসিনার সাহস, জনগণের মধ্যে নতুন গতি সঞ্চার করে।

 

যখন চীনের উহান প্রদেশে করোনাভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে তখনই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকেই করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কাজ শুরু করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী আকাশপথ, স্থল ও নৌবন্দরগুলোতে থার্মাল স্কানার দিয়ে প্রত্যেক যাত্রীকে যাতে পরীক্ষা করা হয় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। যাদের সন্দেহ মনে হয়েছে তাদেরই হোম কোয়ারেন্টাইন করার ব্যবস্থা করা হয়। প্রত্যেক জেলা প্রশাসকের কাছে বিদেশেফেরতদের তালিকা পাঠিয়ে দেয়া হয় যাতে তাদের সবসময় নজরদারির মধ্যে রাখে।

 

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইইডিসিআর ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ৮ মার্চ যখন প্রথম রোগী শনাক্ত হয় তারপর থেকে ধাপে ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, সাধারণ ছুটি ঘোষণা, গণপরিবহন বন্ধসহ জনগণের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার স্বার্থে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। দেশরত্ন শেখ হাসিনার সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে এত বিশাল জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত তুলনামূলক কিছুটা ভালো অবস্থানে আছে।

 

বিশ্বব্যাংক যখন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়ানক হবে অর্থনীতি। সারাবিশ্বকে ক্ষুধা-দারিদ্র্য গ্রাস করবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতিকে সচল রাখার জন্য একজন ঝানু অর্থনীতিবিদের মতো সম্ভাব্য বেহাল অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এখনই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঘোষণা করলেন ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্যাকেজ। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রেক্ষিতে সবচেয়ে বড় আঘাত আসার সম্ভাবনা তৈরি পোশাক খাতসহ রফতানিযোগ্য খাতে। সে জন্যই প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের বেতন ও কল্যাণ বাবদ দুই শতাংশ সুদে ৫০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের জন্য নয় শতাংশ হারে যে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখানে সরকার পাঁচ শতাংশ ভর্তুকির কথা ঘোষণা করেছেন। ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের যেমন দায়িত্ব পালনকালে ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে প্রণোদনাসহ স্বাস্থ্যবীমার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আবার দায়িত্ব অবহেলা করলে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। শুরুর দিকে কিছুটা সমন্বয়ের অভাব থাকলেও এখন প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি মনিটরিংয়ে ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যবিভাগের কর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী, পুলিশ, সিভিল প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই যুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশমাতৃকার যুদ্ধে আজ তারা বীরের ভূমিকায় অবতীর্ণ।

 

প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে যে ৩১ দফা নির্দেশা দিয়েছেন, সেটা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা প্রশংসা করেছেন। আমরা জনগণ যদি মেনে চলি তাহলে অবশ্যই ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যেভাবে প্রতিটি জেলার মাঠ প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাথে কথা বলছেন, দিকনির্দশনা দিচ্ছেন; তার ফলে একদিকে মাঠের সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরাসরি কথা বলার ফলে মাঠপর্যায়ে কাজের গতি বেড়েছে।

 

বিশ্বের অন্য দেশের করোনাযুদ্ধের সাথে বাংলাদেশের যুদ্ধটা সম্পূর্ণ আলাদা। করোনার সাথে সাথে আমাদের খাদ্যের জন্যও ভাবতে হচ্ছে। এদেশে ব্যাপক সংখ্যক লোক দিন আনে দিন খায়। তাদের পক্ষে কাজ ছাড়া ঘরে থাকা সম্ভব নয়, যদি না তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা না হয়। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, কোনো দিনমজুর, শ্রমিক যেন অভুক্ত না থাকে। খেটে খাওয়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ত্রাণ বিতরণের আলাদা তালিকা তৈরি নির্দেশ দিয়েছেন। সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী কৃষক শ্রমিক দিনমজুর রিকশাচালক হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতি বিশেষ নজর দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। জনপ্রতিনিধি প্রশাসনের কর্মকর্তা সকলে মিলেমিশে ত্রাণ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য ওয়ার্ড পর্যায় থেকে তালিকা প্রণয়ন করে কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ত্রাণকার্যে কোনো দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। ইতোমধ্যেই যারা ত্রাণ নিয়ে অনিয়ম করেছে তাদের দ্রুতই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দুর্যোগ আসতেই পারে। দুর্যোগ সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। সে জন্য সবাইকে সেইভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, মনের জোর থাকতে হবে। অনেক দুর্যোগ মোকাবিলা করেছি আমরা, বিজয়ী জাতি মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয়ী হয়েছি। এখানেও আমরা বিজয়ী হব। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাঙালি জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।

 

করোনা পরিস্থিতির পুরো বিষয়টিই মনিটরিং করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। যেকোনো সংকট আসলে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন, কারও ওপর দোষ চাপিয়ে সংকট থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন না বরং দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে সংকট মোকাবিলা করেন, সে জন্যই তিনি রাষ্ট্রনায়ক। এদেশের মানুষের আশা-ভরসার আশ্রয়স্থল। জননেত্রী প্রধানমন্ত্রীর সাহসেই বাংলাদেশ বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তিনি যেদিন বলেছিলেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু করব, তখন কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি। কত পণ্ডিত কত কথা বলেছিল। আজ পদ্মাসেতু দণ্ডায়মান। তলাবিহীন ঝুঁড়ি আজ ৪১তম অর্থনীতির দেশ।১১ লক্ষ সহায় সম্বলহীন রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে মাদার অব হিউম্যানিটি।

 

এ বছরটি আমাদের জাতির পিতার শততম জন্মবার্ষিকী। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে একসাথে উৎযাপনের কথা ছিল, বিশ্বের বরেণ্য রাষ্ট্রপ্রধান, আন্তর্জাতিক অনেক গুণী লোকের অংশগ্রহণ করার কথা ছিল। মূর্খ জ্ঞানপাপীরা বলেছিল ১৭ তারিখের পর করোনার ঘোষণা দেবে সরকার। আপনি যখন ৮ মার্চ শুনলেন করোনার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, তখনই বললেন, অনুষ্ঠান পরও করা যাবে। আগে আমার জনগণ। যে জনগণের অধিকারের জন্য জাতির পিতা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চাননি, সেই জনগণের দিকে তাকিয়ে শুধু আপনার পক্ষ্যেই সম্ভব ছিল জাতি পিতার জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি বাতিল করবার।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা। আপনার রক্তে আছে সংগ্রাম আর বিজয়, যেখানে পরাজয়ের কোনো গ্লানি নেই। আপনার নেতৃত্বে জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ। আপনি বিজয়ী হলেই বাংলাদেশ বিজয়ী হবে। এই করোনাযুদ্ধেও আপনি বিজয়ী হবেন। এই বিজয়ই হবে শততম জন্মবার্ষিকীতে জাতির পিতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

 

লেখক:

তাপস হালদার

সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল