• মঙ্গলবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||

  • আশ্বিন ৭ ১৪২৭

  • || ০৪ সফর ১৪৪২

আজকের টাঙ্গাইল
৯৫২

শিক্ষক নিয়োগ অভিন্ন নীতিমালা: প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০১৯  

অভিন্ন নীতিমালা: বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেসবুক গ্ৰুপে শিক্ষক নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালার প্রস্তাবনা নিয়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। যদি এমনটি হয় বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল বিভাগে একই পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালার মাধ্যমে একই দক্ষতার শিক্ষক নিয়োগের উদ্দেশ্য নিয়ে অভিন্ন নীতিমালা প্রস্তাব করা হয় তাহলে বিষয়টি আমার কাছে হাস্যকর ও বুদ্ধিহীনতার পরিচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। কারন: 

 

১. এক একটি বিশ্ববিদ্যালয় এক একটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলে; যেটিকে বিশ্ববিদ্যালয় এর মিশন ও ভিশন বলা হয়ে থাকে। এই মিশন ও ভিশন এর উপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলো বিভাগের মিশন ও ভিশন ঠিক করে থাকে। উদাহরণ স্বরূপ: কিছু বিশ্ববিদ্যালয় গবেষক প্রস্তুত করার লক্ষ্যে তৈরি হয়; কিছু আছে এডুকেটরস অর্থাৎ সহজ বাংলায় বলতে গেলে শিক্ষক তৈরি করে; আবার কিছু বিশ্ববিদ্যালয় তাত্ত্বিক গবেষণায় নিয়োজিত থাকে ইত্যাদি। এই রকম আরো অনেক ধরনের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। যেমন National University of Singapore এর মিশন বিশ্ব ভবিষ্যৎ গড়া; The Royal Institute of Technology (KTH) এর মিশন ইনোভেশন নিয়ে কাজ করার; University of California এর ভিশন সমাজকে সেবা করা। অর্থাৎ বুঝতেই পারছেন এই বিভিন্ন ধরনের মিশন-ভিশন পরিপূর্ণ করতে গেলে আপনার শিক্ষকের ধরনও বিভিন্ন হবে, যেটি অভিন্ন নীতিমালায় নিয়োগ পদ্ধতিতে কখনোই পূর্ন করা সম্ভব নয়। 

 

২. আমি এমন বিশ্ববিদ্যালয় দেখেছি যেখানে শিক্ষক হবার জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং এ B.Sc. in Engineering থাকলে হয়, যেমন বাংলাদেশ। আবার আমি দেখেছি ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি ছাড়া আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ হতে পারবেন না। আবার আমি যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে M.Sc. (KTH) করেছি ওখানে পিএইচডি করার পর TA (Teaching Assistant) হিসেবে এক বছর কাজ করতে হয়। আবার USA তে কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার যদি খুব ভালো ইন্ড্রাস্ট্রির অভিজ্ঞতা থাকে, আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক অথবা অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিতে পারবেন। এখন আসলে কোন যোগ্যতাই কোন বিশ্ববিদ্যালয় কোন শিক্ষক নিয়োগ দিবে সেটি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আপনার দেশে সহজলভ্য ডিগ্ৰিধারী অথবা চাকুরীর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানবসম্পদ কি পরিমাণ আছে তার উপর। যেমন আজ থেকে দশ বছর আগে যদি বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নিত ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ গুলোত পিএইচডি ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে না তাহলে হয়তো শিক্ষক পাওয়া যেতো কিনা সন্দেহ। এমনকি আমার  অভিজ্ঞতা বলে হয়তো এখনো পিএইচডি ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে সম্ভব নয়। কারণ শিক্ষকের অপ্রতুলতা আছে বলেই এখনো প্রতি শিক্ষককে ১৫ থেকে ১৮ ঘন্টা ক্লাস নিতে হয় যেটি ক্লাসের মানোন্নয়নে সবচেয়ে বড় বাধা।

 

৩. সাধারণত একটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশন ভিশন, ভৌগলিক অবস্থান, দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়ন প্রভৃতি চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয় কোন ধরণের শিক্ষক কোন যোগ্যতার শিক্ষক কিভাবে নিয়োগ দিবেন। 

 

উপরোক্ত তিনটি বিষয় মোটামুটি ভাবে পরিষ্কার করে অভিন্ন নীতিমালায় নিয়োগ আসলে একটা হাস্যকর প্রস্তাব।

 

যেটি প্রস্তাব করা যেতে পারতো বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো পরিবর্তন, বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি যোগ্য সংস্থা দ্বারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা, এবং সে পর্যবেক্ষণ এর উপর ভিত্তি করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রম তৈরি করা। এই ক্রমটি সরকার কর্তৃক প্রকাশিত হবে সাধারণ জনগণের কাছে। এই ক্রমানুসারে চাকুরী ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হবে। তাহলে সকল ছাত্র-ছাত্রীদের ভালো ক্রমের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার আগ্ৰহ বাড়বে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করবে। 

 

কিছু অভিন্ন নীতিমালা তৈরি হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যেমন প্রথমত একটি লিখিত পরীক্ষা থাকবে যেখানে বিভাগ সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন থাকবে যার মধ্যে ক্রিয়েটিভ অংশটা কে প্রাধান্য দেওয়া হবে মুখস্থ বিদ্যাকে নয়। 

 

দ্বিতীয়তঃ ওই লিখিত পরীক্ষায় আরেকটি অংশ থাকবে যেখানে পরীক্ষার্থীর বাংলাদেশ সম্পর্কিত ইতিহাস ও পরীক্ষার্থীর দার্শনিক চিন্তা ও ভাবনা পরখ করে দেখা হবে (এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো পর্যবেক্ষণটি কোনভাবেই বাংলাদেশের বিসিএস পরীক্ষার সাথে মেলাবেন না যেখানে কোন দেশের রাজধানী বা মুদ্রার নাম কি এসব প্রশ্ন থাকে)। 

 

তৃতীয়তঃ পরীক্ষার্থীর একটি আইকিউ টেস্ট নেওয়া হবে যেটি দ্বারা পরীক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

 

লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে পরীক্ষার্থীর একটি মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে যেখানে অবশ্যই পরীক্ষার্থীকে একটি ছোট প্রেজেন্টেশন দিতে হবে যার দ্বারা পরীক্ষার্থীর কথা বলতে পারার ক্ষমতা পরখ করে দেখা হবে। 

 

সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে অভিন্ন নিয়মে প্রমোশন হতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক অত্যাধুনিক প্রমোশন নির্ণায়ক তৈরি হতে পারে। শুধুমাত্র চাকুরী অভিজ্ঞতা ও গবেষণা পত্রের সংখ্যার উপর প্রমোশন হাস্যকর। গবেষণা পত্রের গুনাগুণ একটি অতীব জরুরি বিষয় যেটি বাংলাদেশে একদমই উহ্য রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের অধিকাংশ জার্নাল অনলাইনে দেয়া হয় না; শুধুমাত্র প্রিন্ট কপি থাকে। এই প্রিন্ট কপি জার্নাল অন্য পাঠকের কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তাই যদি অনলাইন কপি থাকে তাহলে অন্য গবেষকরা পড়বে এবং হয়তো ভালো আর্টিকেল হলে সাইটেশন দেয়া হবে। ফলাফল জার্নালের গুনাগুণ বাড়বে।

 

একজন শিক্ষক সপ্তাহে কত ঘন্টা ক্লাস নিবেন, কত ঘন্টা ক্লাসের প্রিপারেশন নিবেন, কত ঘন্টা দাপ্তরিক কাজ করবেন, কত ঘন্টা গবেষণা করবেন ইত্যাদি বিষয়গুলো সরকার কর্তৃক নির্ধারিত করা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় এর কোয়ালিটি উন্নয়নের পথচলাটা অনেক বেশি সহজ হবে।

 

এত কিছুর বাইরে সর্বোপরি যে বিষয়টির প্রতি নজর দিতে হবে তা হচ্ছে দুর্নীতি ও ঘুষ কেলেঙ্কারি থেকে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দূরে রাখা।

 

টুটন চন্দ্র মল্লিক

সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান,

তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগ,

প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল
বিশেষজ্ঞদের কলাম বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর