• বৃহস্পতিবার   ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ১৩ ১৪২৭

  • || ১৩ রজব ১৪৪২

আজকের টাঙ্গাইল

মুসলিম দেশগুলোতে যত ভাস্কর্য

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ২৯ নভেম্বর ২০২০  

কি নিয়ে আসলে একটি দেশ? কিভাবে ফুটে উঠে তার নিজস্ব স্বকীয়তা? দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি-কালচারের সাক্ষীই বা কে বহন করে? স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, ভাস্কর্য তার একটি মোক্ষম উপাদান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের ঐতিহ্য, কালচার এসবের ওপর ভিত্তি করে নানান ধরণের ভাস্কর্য তৈরি করে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে নিয়ে যায় দেশটির সৌন্দর্য, কৃষ্টি কালচার, মানুষে মানুষে বন্ধনের রেস, আরও কতকিছু!মুসলিম দেশগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। কট্টর মুসলিম প্রধান দেশ সৌদি আরব থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, মিশর, ইরান, ইরাক, তুরস্ক, কাতার এরকম বহু দেশ আছে তারা তাদের সংস্কৃতিকে বহন করে চলেছে এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে।

 

এক নজরে জেনে নেয়া যাক, সেসব মুসলিম দেশের কথা, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে নানান ভাস্কর্য।

 

 

সৌদি আরবে ভাস্কর্য

ইসলামের পুণ্যময় ভূমি বলা হয়ে থাকে সৌদি আরবকে। ইসলাম ধর্মের পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা এই দেশে অবস্থিত। প্রতি বছর অগণিত মুসলমান সেখানে যান। শতভাগ মুসলিম দেশ সৌদি আরবের বাণিজ্যিক রাজধানী জেদ্দা নগরীতে আছে উটের দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য। রাজধানী জেদ্দার উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্যের মধ্যে রয়েছে নগরীতে মুষ্টিবদ্ধ হাত, হাংরি হর্স, মানব চোখ, মরুর বুকে উটের ভাস্কর্য। আফগানিস্তানের জঙ্গিরাও হাত দেয়নি অষ্টম শতকের সমরনায়ক আবু মুসলিম খোরাসানির ভাস্কর্যের গাঁয়ে। গজনীতে এখনও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে সেই ভাস্কর্য। সৌদি আরব নামকরণটি হয়েছে এ দেশের শাসনকারী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আজিজ আল সউদের নামানুসারে। সভ্যতার শুরু থেকে এখানেও শিল্পকর্মের প্রতি মানুষের আলাদা একটা টান রয়েছে।

 

 

মালয়েশিয়ায় ভাস্কর্য

মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। মালয়েশিয়ার অবস্থান মুসলিম বিশ্বে ১৩তম। দুই কোটি ৮০ লাখের জনসংখ্যার দেশটির ৬০.৪ শতাংশ মানুষই মুসলিম। সেখানেও রয়েছে অনেক দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য। মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত ভাস্কর্য হলো ওয়াশিংটন মনুমেন্টের আদলে গড়া ন্যাশনাল মনুমেন্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শহীদ হওয়া বীরদের স্মরণে ১৫ মিটারের এই ভাস্কর্যটি উন্মুক্ত করা হয় ১৬৬৩ সালে। প্রতীকীভাবে সাতজন বীরের প্রতিমূর্তির মাধ্যমে বিশ্বস্ততা, আত্মত্যাগ আর বন্ধুত্বের বিষয়টি এই ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে। মালয়েশিয়ার ভাস্কর্যশিল্প সনাতন ও আধুনিক ধারার এক স্বতন্ত্র মেলবন্ধন। মালয়েশিয়ার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্যগুলো হলো বাতু কেভসের বিখ্যাত মুরুগান মূর্তি, কুচিং হলিডে ইন হোটেলের সামনে মার্জার মূর্তি এবং কনফুসিয়াসের মূর্তি। এখানে এসব ভাস্কর্য পরিদর্শনে পর্যটকরা নিয়মিত এসে থাকেন। ন্যাশনাল মনুমেন্টই সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত।

 

 

কাতারে ভাস্কর্য

পারস্য উপসাগরের দেশ কাতার। দক্ষিণ আরবীয় অঞ্চলে ইসলাম প্রসারে আলা আল হাদরামি সেখানে যান ৬২৮ সালে। তখন কাতার অঞ্চলে শাসন করছিল স্থানীয় বনু তামিম গোত্র। বনু তামিমের গোত্র প্রধান মুনযির বিন সাওয়া আল তামিমি ইসলাম গ্রহণে সম্মত হন এবং পরে অন্যান্য গোত্রে ইসলাম প্রসারে ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটি কাতার। মোট জনসংখ্যার ৭৭.৫ শতাংশ মুসলিম। কাতারেও দেখা যায় ব্যয়বহুল ও দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য। কাতারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য হলো ‘হারনেসিং দ্য ওয়ার্ল্ড’, মানে হচ্ছে বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ। কাতারের রাজধানী দোহায় কাতার সংস্কৃতি কেন্দ্রে কাতারা আম্পি থিয়েটারের সামনে স্থাপিত হয় পুরো পৃথিবীকে সংযোগ স্থাপন করা নারী প্রতিমূর্তির অবয়বের এই ভাস্কর্য। বিশ্বের নানা প্রান্তের পর্যটকদের জন্য এটি আকর্ষণীয় স্থান।

 

 

 সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভাস্কর্য

১৯৭১ সালে ১৪ দিনের ব্যবধানে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ আর সংযুক্ত আরব আমিরাত। আমিরাত বিশ্বের উন্নত দেশের কাতারে শামিল এখন। সংযুক্ত আরব আমিরাত মধ্যপ্রাচ্যে আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় অবস্থিত সাতটি স্বাধীন রাষ্ট্রের একটি ফেডারেশন। এগুলো একসময় ট্রুসিয়াল স্টেটস নামে পরিচিত ছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য হলো আরবীয় যুগলের মূর্তি, দুবাইয়ের ওয়াফি অঞ্চলের প্রবেশপথে পাহারাদারের প্রতিমূর্তি হিসেবে সংস্থাপিত কুকুরের মূর্তি, দুবাইয়ের ইবনে বতুতা মার্কেটে স্থাপিত মূর্তি।

 

 

তুরস্কে ভাস্কর্য

তুরস্কের প্রথম প্রেসিডেন্ট মোস্তফা কামাল তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর নেতৃত্বে খেলাফত শাসনের অবসান ঘটিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ এক আধুনিক তুরস্কের যাত্রা শুরু হয়। তিনি আধুনিক তুরস্কের জনক। তুর্কি ভাষায় ‘আতা’ মানে জনক। ‘তুর্ক’ তো তুরস্ক। তাই তিনি আতাতুর্ক। স্বাভাবিকভাবেই তুরস্কজুড়ে রয়েছে কামাল আতাতুর্কের ভাস্কর্য। এককালের সারা মুসলিম জাহানের খলিফার দেশ তুরস্ক সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও জনসংখ্যার বেশিরভাগই মুসলিম। সারা তুরস্কের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে প্রেসিডেন্ট কামাল আতাতুর্কের অগণিত মূর্তি। একেকটি দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্যে একেক রকমভাবে আতাতুর্ক এবং তুরস্কের ইতিহাস, ঐতিহ্য বিবৃত করা হয়েছে। কামাল আতাতুর্কের ভাস্কর্য ছাড়াও তুরস্কের উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য হলো মর্মর সাগর তীরে পোতাশ্রয়ে অপূর্ব মর্মর মূর্তি, আঙ্কারাতে ইন্ডিপেনডেন্স টাওয়ারের পাদদেশে তুরস্কের জাতীয় সংস্কৃতির ধারক তিন নারী মূর্তি ও আন্তালিয়ায় এডুকেশন অ্যাক্টিভিস্ট তুরকান সায়লানের মূর্তি। তুরস্ক ভ্রমণে এসব মূর্তি ভ্রমণপিপাসুদের নজর কাড়ে।

 

 

ইরাকজুড়ে ভাস্কর্য

ইসলামি স্বর্ণযুগের প্রতিভূ ইরাক। জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশ মুসলিম। ইরাকেও আছে অনেক ভাস্কর্য। বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে ডানার ভাস্কর্যটি সবার নজর কাড়ে। বাগদাদের পাশে আল-মনসুর শহরে আছে মনসুরের একটি বিশাল ভাস্কর্য। আছে অনেক সাধারণ সৈনিকের ভাস্কর্য। সাদ্দাম হোসেনের বিশাল আকারের ভাস্কর্য ছিল যেটি আর এখন নেই। ৭ হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতির সন্ধান পাওয়া গেছে এই দেশে। রাজনৈতিক কারণে  গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় সাদ্দাম হোসেনের সব মূর্তি। তাই বলে ভাস্কর্যহীন হয়নি ইরাক। প্রচুর ঐতিহাসিক ও দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্যের মালিক দেশটি। রাজধানী বাগদাদেও বেশ কিছু বিখ্যাত মূর্তি রয়েছে। যেমন ইন্টারন্যাশনাল জোনে হাম্মুরাবির মূর্তি। আরব্য উপন্যাসের প্রধান চরিত্র শাহেরজাদি এবং রাজা শাহরিয়ারের মূর্তি রয়েছে।

 

 

ইরানে ভাস্কর্য

ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইরান অন্যতম। পারস্যের ইতিহাসের সূচনা প্রায় এক লাখ বছর আগে থেকে। ইরানে আছে একটি বিশাল স্বাধীনতাস্তম্ভ, যার নাম ‘আজাদি’। এ স্থাপত্যটির ডিজাইনার হোসেন আমানত একজন মুসলমান। কবি ফেরদৌসী, ওমর খৈয়াম, পারস্যের নেপোলিয়ন বলে খ্যাত নাদির শাহর মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিদের ভাস্কর্য রয়েছে ইরানে। মাশহাদ নগরীতে ভাস্কর্যসংবলিত নাদির শাহর সমাধিসৌধটি পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। বেশির ভাগই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের স্মরণে নির্মিত। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- তেহরানের ফেরদৌসী স্কয়ারে স্থাপিত মহাকবি ফেরদৌসীর মূর্তি, ইরানের হামাদানে ইবনে সিনার মূর্তি, তেহরানের লালেহ পার্কে রয়েছে ওমর খৈয়ামের ভাস্কর্য, কবি হাফিজের ভাস্কর্য। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি বা ইমাম খোমেনির একাধিক ভাস্কর্য ও ম্যুরাল রয়েছে ইরানে। এর মাধ্যমে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিপ্ল­বের আদর্শ তুলে ধরা হয়েছে।

 

 

ইন্দোনেশিয়ায় ভাস্কর্য

সবচেয়ে বেশি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ইন্দোনেশিয়া। সেই দেশেরই উত্তর সুলাবেসি দ্বীপের খ্রিষ্টান অধ্যুষিত শহর মানাদোতে রয়েছে যিশু খ্রিষ্টের এমন একটি ভাস্কর্য, যেটি এশিয়ায় সবচেয়ে উঁচু। ৩২ মিটার উঁচু একটি পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ৩০ মিটার উঁচু ভাস্কর্যটি। এই ভাস্কর্য নিয়ে কোন অভিযোগ নেই ইন্দোনেশীয় মুসলমানদের। ইন্দোনেশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। প্রায় ৫ হাজার দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এ দেশটি পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। দ্বাদশ শতকের দিকে ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামের আগমন ঘটে এবং ১৬শ শতক নাগাদ জাভা ও সুমাত্রার লোকেরা ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়ে যায়। ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার দ্বীপ রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৬ হাজার দ্বীপে মানুষ বসতি স্থাপন করেছে। সুমাত্রা, জাভা, সুলাওয়েসি, বোর্নিও ও নিউ গিনি পাঁচটি প্রধান দ্বীপ। প্রচুর ভাস্কর্য রয়েছে গোটা দেশজুড়েই। এর মধ্যে বালিতে ভাস্কর্যের সংখ্যা বেশি।

 

 

মিশরে ভাস্কর্য

পিরামিডের জন্য দুনিয়াজোড়া খ্যাতি মিসরের। বিরাটত্বের দিক থেকে বিখ্যাত হলো জোসার বা স্টেপ (সোপান) পিরামিড ও গিজা পিরামিড। পাথরের তৈরি স্ফিংসের মূর্তিসংবলিত গিজা পিরামিড সারা দুনিয়ার পর্যটকদের অতি প্রিয়। শুধু ইসলাম-পূর্বই নয়, অনেক অনেককাল আগের তথা খ্রিস্টপূর্ব আড়াই হাজার অব্দের এসব মূর্তি মিসরের মুসলমানরা ধ্বংস করেনি। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে মাহমুদ মোখতারের বিখ্যাত ভাস্কর্য ‘‘ইজিপ্ট’স রেনেসাঁ’’।

 

 

পাকিস্তানে ভাস্কর্য

পাকিস্তানে রয়েছে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ভাস্কর্য। রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য শিল্প। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— স্টক এক্সচেঞ্জ ভবনের সামনে ষাঁড়ের ভাস্কর্য, লাহোরে বাদশাহি মসজিদের পার্শ্বে মেরি মাতার ভাস্কর্য। পাঞ্জাবের জং শহরের রাস্তায় ঐতিহ্যবাহী ঘোড়সওয়ারের ভাস্কর্য। লাহোরে ন্যাশনাল কলেজ অব আর্টস প্রাঙ্গণের নানা ভাস্কর্য। এ ছাড়া,তাজাকিস্থানের রাজধানী দুশানবেতে ইবনে সিনার একটি বিশাল ভাস্কর্য আছে। মুসলিমপ্রধান ওই দেশের কোনো নাগরিক ভাস্কর্য নিয়ে, নেতিবাচক কোন কথা বলেন না।

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল