• মঙ্গলবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||

  • আশ্বিন ৭ ১৪২৭

  • || ০৪ সফর ১৪৪২

আজকের টাঙ্গাইল
২৫২

মধুপুরে বাণিজ্যিক ভাবে চাষ হচ্ছে বনসাই

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ৬ জুন ২০২০  

জীবন্ত এক শিল্পের নাম বনসাই। নান্দনিকতায় যার বৈশিষ্ট্য। এক সময় অভিজাত ও সভ্রান্তদের প্রাসাদ বা অট্টালিকায় চিত্রকলার মতো এর স্থান ছিল। কিন্তু কালক্রমে মধ্যবিত্তের ঘরেও এখন শোভা পাচ্ছে বনসাই।

 

বনসাই জাপানী শব্দ। প্রাচীন চীনা শব্দ পেনজাই থেকে জাপানী বনসাই শব্দের উৎপত্তি। বন মানে পাত্র আর সাই হলো গাছ। অর্থাৎ বিশেষ কৌশল ও পদ্ধতিতে পাত্রে গাছের শৈল্পিক অবয়ব দেয়ার নাম বনসাই। বনসাই করতে যে পাত্র ব্যবহার করা হয় তাকেই সাধারণ ভাবে বন বলা হয়। পাশ্চাত্যে পাত্রে খর্বাকৃতির গাছ বলতে বনসাই বলা হয়। একটি শক্ত কাণ্ড বিশিষ্ট গাছকে এটি ছোট্ট পটে রেখে বছরের পর বছর ধরে পরিচর্যার মাধ্যমে এটিকে বাঁচিয়ে রাখার শিল্পকে বনসাই বলা হয়।

 

জাপানের রাজপ্রাসাদে এর প্রথম প্রচলন। চীন ও জাপানের মধ্যে প্রাচীন কাল থেকে থেকে শত্রুতা থাকলেও জাপানের সম্রাটরা চীনের রাজপ্রাসাদে এটি প্রথম উপঢৌকন হিসাবে প্রেরণ করেন। মূলত বনসাইকে আধুনিক শৈল্পিক রূপ প্রদানের কাজটি করেন চৈনিকরা। বলা অনাবশ্যক, প্রাচীনকালে চীনের মানুষ পা ছোট রাখার জন্য লোহার জুতো পড়তো। বনসাইয়ের সাথে এ সাদৃশ্য অনেকটাই কাজ করেছিল বলে অনেকে মনে করে থাকেন।

 

বনসাই আমদের দেশেও ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় এবং সৌখিন শিল্প হিসাবে গড়ে উঠছে। রাজধানী ঢাকা এবং চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেট মহানগরী ছাড়িয়ে বনসাইয়ের বাণিজ্যিক প্রসারতা গৈগেরামে পৌঁছে গেছে।

 

বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটির সভাপতি নাজমা শফিক জানান, এক সময়ে আমাদের দেশের অনেক প্রকৃতি বিশারদ বনসাইকে শিল্প নয়, প্রকৃতির প্রতি নিষ্ঠুরতার আখ্যা দিতেন। গাছের এ নান্দকিতাকে তারা বামুন মানুষের সাথে তুলনা করতেন। কেউ কেউ এ ধাপ এগিয়ে এটিকে ইটপাথরের গুপ্ত গুহায় প্রকৃতিকে নিষ্ঠুরভাবে আটকিয়ে রাখার ফন্দি বলে প্রচার করতেন।

 

কিন্তু কালক্রমে অনেকেই বুঝতে পেরেছেন বনসাই এক ধরনের প্রাকৃতিক রূপায়ন। প্রকৃতিকে মিনিয়েচার চিত্র শিল্পের মতো ক্ষুদ্র সংস্করণের নান্দনিক উপস্থাপনা। আসলে বনসাই একটি জীবন্ত শিল্প। ইটপাথরের নিষ্প্রাণ নগরে সবুজায়নের শৈল্পিক উপমা। দেশের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ এখন বনসাই শিল্পের সাথে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

 

বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটির সম্পাদক মো. আনিসুল হক জানান, অরণ্য-গ্রাম-শহর সর্বত্রই চলছে পুরনো সব গাছের ধ্বংস যজ্ঞ। বনসাই শিল্পীরা ছোট্ট পরিসরে সামান্য কিছু গাছ দিয়ে পুরনো গাছের আকৃতিকে অনুসরণ করে শৈল্পিক নিদর্শন তৈরির চেষ্টা করেন। বিশাল প্রকৃতির সমারোহ থেকে এ যেন ক্ষুদ্র এক উপহার। একান্তই নিজের করে পাওয়ার চেষ্টা।

 

একটি সাধারণ গাছকে শৈল্পিক রূপ দেয়ার কলাকৌশল সঠিকভাবে জেনে অন্যকে জানানো এবং এর শৈল্পিক প্রচারপ্রসার ঘটানোর মানসে গড়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটি। এর মাধ্যমে প্রতিবছর বনসাইয়ের প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এ পর্যন্ত দেশে ২১টি প্রদর্শনী হয়েছে।

 

বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটির প্রকাশনা সম্পাদক এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. সোলায়মান জানান, প্রকৃতির সাথে সখ্যতা সৃষ্টির মাধ্যমে জীবনকে প্রাণময় করাই বনসাই শিল্পের লক্ষ। ইটপাথরের নগরে সবুজের সমারোহ নেই বললেই চলে। ছোট্ট একখণ্ড জমিতে বাড়ি নির্মাণের পর দুএকটা গাছ লাগানোর মতো কোন জায়গা অবশিষ্ট থাকেনা।

 

এমতাবস্থায় সবুজের চাহিদা মেটাতে বাড়ির ছাদ বা বারান্দা বেছে নিয়ে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার ইদিলপুর গ্রামের পুলক সাংমা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বনসাইয়ের আবাদ করছেন।

 

গজারি বন ঘেরা গারো গ্রাম ইদিলপুর এখন নানা কারণে বনশূণ্য। এটি তাকে ব্যথিত করে। পরিবেশ রক্ষায় বাড়ির আশপাশে তিনি প্রচুর বনজ ও ফলদ গাছ লাগান। এরপর আলাদাভাবে বনসাইয়ের বাগান করে গাছের শৈল্পিক রূপ দিয়ে ব্যবসায়িক সাফল্যের পরিকল্পনা নেন। সফলতা ও লাভ তিনি।

 

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, লাল মাটির উঁচু টিলার ৫০ শতাংশ জমিতে সুদৃশ্য বনসাই বাগান। তাতে নানা রং ও আকারের পাত্রে থরে থরে সাজানো চার শতাধিক বনসাই। কোনটির বয়স বয়স ২০ থেকে ২৫ বছর। দুই থেকে ১৯ বছর বয়সী বনসাইও রয়েছে। বনসাইয়ের চারাও তিনি বিক্রি করেন। কোন কোন গাছের পূর্ণ শৈল্পিক মাত্রা দিতে ৫০ বছর ও লেগে যায়। কাজেই বনসাই দীর্ঘ মেয়াদী শৈল্পিক সৃষ্টি বা পণ্য উৎপাদনের ব্যবসা। এতে অনেক ধৈর্য ও সময়ের পরীক্ষা দিতে হয়।

 

পুলক সাংমা ২০০৫ সালে এ ব্যবসায় নামেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটি থেকে হাতেকলমে শিক্ষা নেন। তার বাগানে পাকুড, বট, জাম, জারুল, সেওডা, ডুমুর, হিজল, তমাল, তেঁতুল, কামিনী, জবা, আমবট, গন্ধরাজ, চায়না বট, মালফুজিয়া, কোকেনট্রি, এজিনিয়া, জলডংগাসহ ২৫ প্রজাতির গাছের বনসাই রয়েছে। লিচু বাগানের ফাঁকে ফাঁকে সারি করে বনসাই পাত্র রেখেছেন।

 

বনসাইয়ের জন্য রোদ লাগেনা। বেঁচে থাকার জন্য আলোছায়াই যথেষ্ট। এ জন্য একই জমিতে লিচু ও বনসাইয়ের মিশ্র আবাদে কোন অসুবিধা হচ্ছেনা। দুজন লেবার নিয়ে সারা বছর বাগানে কাজ করেন তিনি।

 

বাগানে এখন কোটি টাকার বনসাই রয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতারা আসেন বাগান দেখতে। সৌখিনরা কিনেও নিয়ে যান। প্রায় ১৩ লক্ষ টাকার বনসাই তিনি বিক্রি করেছেন।

 

পুলক জানান, ছবি আঁকতে বা ভাস্কর্য গড়তে যেমন একজন শিল্পীকে সাবধানতার সাথে কতক স্তর বা পর্যায় অতিক্রম করতে হয়, তেমনি বনসাইয়ের ভঙ্গিমা, আকার ও শৈল্পিক রূপায়নে যত্নবান হতে হয়।

 

তিনি আরো জানান, যেসব গাছে ধীরে বাড়ে, কাণ্ড ও ছাল মোটা ও শক্ত হয়, বছরে একবার পত্র ঝরে এবং কাণ্ড বেয়ে ঝুরি নামে, সেসব গাছের বনসাই বানাতে সুবিধা বেশি। বেঁচেও থাকে বেশি দিন। বিভিন্ন জাতের বনসাইকে তিন ধরনের শেপ হয়। স্মল শেপ। মিডিয়াম শেপ এবং লার্জ শেপ।

 

করোনার কারণে বনসাই শিল্প বিপণনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এজন্য তিনি বনসাই শিল্পে সরকারকে প্রণোদনা দেয়ার অনুরোধ জানান। পুলক সাংমাকে অনুসরণ করে মধুপুর উপজেলার জলছত্র গ্রামের সুমি নার্সারির মালিক উমর শরীফ বনসাই তৈরি করছেন।

 

তিনি জানান, বনসাই ব্যবসা দীর্ঘ মেয়াদী বিষয়। তাই লাভজনক হলেও অনেকেই এত পুঁজি বিনিয়োগ করতে চান না।

 

বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটির কোষাধ্যক্ষ সৈয়দা আমিনা হক মীনা জানান, দেশে এখন মান সম্পন্ন বনসাই সৃজিত হচ্ছে। এ শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোতে বনসাই রফতানির সম্ভাবনা উজ্জ্বল রয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে রফতানি খাতে বনসাই ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে জানান তিনি।

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল
টাঙ্গাইল বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর