• বুধবার   ১২ মে ২০২১ ||

  • বৈশাখ ২৯ ১৪২৮

  • || ৩০ রমজান ১৪৪২

আজকের টাঙ্গাইল
সর্বশেষ:
ধুনটে নমুনা শস্য কর্তনের উদ্বোধন বকশীগঞ্জের নিলাক্ষিয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলনের ড্রেজার মেশিন ধ্বংস প্রধানমন্ত্রীর উপহার কর্মহীনদের মাঝে তুলে দিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী সখীপুরে এমপি’র উন্নোয়নমূলক কাজের প্রশংসা করে গেইট ও বিলবোর্ড বকশীগঞ্জে ৪৪ জন মহিলার মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ সখীপুরে আর্ত-সন্ধ্যাণ ব্লাড ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ঈদ সামগ্রী বিতরণ বকশীগঞ্জ মাস জুড়ে ইফতার বিতরণ করছে থানা পুলিশ দেওয়ানগঞ্জে দরিদ্র পরিবারদের মাঝে ঈদবস্ত্র ও নগদ অর্থ বিতরণ ঘাটাইল উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতৃবৃন্দকে জেলার সতর্কবার্তা গরীবের সাহায্য আত্মসাৎকারী ভিক্ষুকের চেয়ে খারাপ : মির্জা আজম

বদরে ইসলামের প্রথম সূর্যোদয়- মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০২১  

বদরের যুদ্ধে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ, ইনসেটে লেখক মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক

বদরের যুদ্ধে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ, ইনসেটে লেখক মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক

বদর যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। ইসলাম ও মুসলমানের বিজয়ের গৌরবগাঁথার প্রথম সূর্যোদয়। 

 

আজ থেকে প্রায় ১৫০০ বছর আগে ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৬ মার্চ, ২ হিজরির ১৭ রমজান মদিনার মুসলিম ও মক্কার অমুসলিমদের মধ্যে সংঘটিত হয় সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী যুদ্ধ, ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার প্রথম-রক্তঝরা মহাসংগ্রাম: জঙ্গে বদর, গজওয়ায়ে বদর বা বদরের যুদ্ধ। 

 

মদিনা উপকণ্ঠ থেকে ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বদর প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ। এই যুদ্ধের আগে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে বেশ কিছু খ-যুদ্ধ হয়। কিন্তু বদর ছিল দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম বড় আকারের যুদ্ধ। 

 

যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসুল (সা.) আল্লাহর দরবারে আরজ করেন, 'হে আল্লাহ, এই কাফিররা চরম ঔদ্ধত্য ও অহমিকা নিয়ে এসেছে তোমার রাসুলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে। অতএব, আমায় যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি তুমি দিয়েছিলে, এখন সে সাহায্য প্রেরণ করো। 

 

হে আল্লাহ, আজ এই মুষ্টিমেয় দলটি যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে দুনিয়ায় তোমার বন্দেগি করার আর কেউ থাকবে না।' ইসলামের এ প্রথম সামরিক যুদ্ধে রাসুল (সা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। মুসলিমদের এই বিজয় অন্যদের কাছে এই বার্তা পৌঁছায় যে, মুসলিমরা আরবে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং বিজয়ের ফলে রাসুল (সা.)-এর অবস্থান আরো সুদৃঢ় হয়। রাসুল (সা.) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর দীর্ঘ ১৩ বছর অতিবাহিত করেন মক্কা’য়। এরপর তিনি আল্লাহর হুকুমে মক্কা’য় বসবাসরত সাহাবিদের নিয়ে পর্যায়ক্রমে মদিনায় হিজরত করেন। 

 

হিজরতের দ্বিতীয় বছরেই রাসুল (সা.)-এর নেতৃত্বে গঠিত মদিনা রাষ্ট্রটি মক্কার কাফের শক্তির পক্ষ থেকে হুমকির মুখোমুখি হয়। সিরিয়া থেকে ফেরার পথে মক্কার কাফেরদের একটি বাণিজ্য কাফেলা মুসলিম শক্তির প্রতিরোধের মুখে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে মক্কা থেকে এক হাজার কাফের সেনার একটি সশস্ত্র দল মদিনা থেকে ৮০ মাইল দূরে অবস্থিত 'বদর' ময়দানে এসে যুদ্ধপ্রস্তুতি শুরু করে। এ অবস্থায় মাত্র ৩১৩ জন সাহাবিকে নিয়ে বদর ময়দানে উপস্থিত হন রাসুল (সা.)। রাসুল (সা.) স্বয়ং যুদ্ধ পরিচালনা করেন। আল আরিসা পাহাড়ের পাদদেশে মুসলিম বাহিনীর শিবির স্থাপন করা হয়। ফলে পানির কূপগুলো তাদের আয়ত্তে ছিল। রাসুল (সা.) সেনা সমাবেশের জন্য এমন একটি জায়গাই বেছে নেন, যেখানে সূর্যোদয়ের পর যুদ্ধ হলে কোনো মুসলমান সেনার চোখে সূর্য কিরণ পড়বে না। অমুসলিমদের সেনাসংখ্যা ছিল ১০০০। ছিল ১০০টি ঘোড়া, ৬০০ লৌহবর্ম এবং অসংখ্য উট। অমুসলিমদের সেনাপতি ছিল ওতবা বিন রবিআ। যুদ্ধে ৭০ জন অমুসলিম নিহত হন এবং বন্দীও হন ৭০ জন। মুসলিম বাহিনীতে সেনাসংখ্যা ছিলেন ৩১৩ জন। মুহাজির ছিলেন ৮২ জন। আর বাকি সবাই আনসার। আওস গোত্রের ৬১ জন এবং খাজরাজ গোত্রের ১৭০ জন। মুসলিমদের উট ও ঘোড়ার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে: ৭০টি ও ২ টি। যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর ১৪ জন শাহাদাৎ বরণ করেন। বদর যুদ্ধে সাহসী দুজন কিশোর একজন মাআজ অপরজন মুআ ওয়াজ এর হাতে ইসলামের প্রধান শত্রু আবু জাহেলের নিহত হওয়া উল্লেখযোগ্য। বদরের প্রান্তে যদি মুসলমানরা জয়ী না হতেন, ফলাফল কী হতো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মুসলমানদের পৃথিবী থেকে নিঃশ্বেষ করার যে অভিপ্রায় নিয়ে নকশা আঁকতে লাগলো মক্কার কাফেররা। আল্লাহর একত্ববাদের স্বরদকে স্তিমিত করতে তারা কৌশল আঁটে। গোত্রে, গোত্রে, লাত-মানাতের দোহাই দিয়ে যুদ্ধের সংবাদ পাঠায়। তখন মদিনায় সাড়া পড়ে যায়। এক আল্লাহর দ্বীনকে দুনিয়ার তাগুতি শক্তির থেকে রক্ষার জন্য যুদ্ধের ঘোষণা দেন রাসুল (সা.)। মদিনার গলিতে গলিতে তখন উৎসব। নিজেকে আল্লাহর সম্মুখে উৎসর্গ করার মোক্ষম সুযোগ পেল সৌভাগ্যবানরা। শহীদের আকাঙ্খায় উদ্বেল এক একটি মন। অন্তরে জেগে ওঠে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর প্রেম। তাঁরা বলতে লাগলেন- হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আমরা আপনার প্রতি ইমান এনেছি, আপনাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি, আপনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন, তা সবই সত্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছি, সর্বোপরি আপনার আনুগত্যের শপথ নিয়েছি। অতএব, আপনি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাই কার্যে পরিণত করুন। সে মহান সত্তার শপথ আপনি যদি আমাদের নিয়ে সমুদ্রে গিয়েও ঝাঁপ দেন, তবু আমরা আপনার সঙ্গে থাকব এবং এ ব্যাপারে একটি লোকও পিছিয়ে যাবে না। আমরা শপথ নিয়েছি, যুদ্ধকালে তা আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। আমরা যেকোনো মূল্যে শত্রুর মোকাবিলা করব। খুশি হন মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)। বাহ্যত দুর্বল, ক্ষীণকায় সবদিকে পেছানো মুসলমানদের ঈমানের জ্যোতির কারণে আল্লাহ ঘোষণা দেন তাঁদের বিজয়ের। আসমান থেকে ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্যের। এ যুদ্ধের মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। কাফিরদের দাপট ধুলায় মিশে দিলেন, চিরদিনের জন্য তাগুতি শক্তির অসারতা প্রমাণিত হলো। যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহর হুকুম মেনে যুদ্ধ করার কারণে বিজয় এসেছিল। দুনিয়ার বুকে এ কথা প্রতিষ্ঠিত হলো যে, মুসলিম জাতি যদি বদরি সাহাবিদের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর প্রেমের পরিচয় দিতে পারে, তবে দুনিয়ার কোনো শক্তি তাদের ক্ষতি করতে পারবে না।

বদরের যুদ্ধ সে সময় সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। সাহাবায়ে কেরামগণ কাফিরদের তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে যেভাবে নিজেদের আত্মনিয়োজিত করেছেন, ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত বিরল। মদিনার অন্য আরব গোত্রগুলো মুসলিমদের নতুন শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করে। যুদ্ধ জয়ের ফলে রাসুল (সা.)-এর কর্তৃত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। বদর যুদ্ধের বিজয় আমাদের এই শিক্ষাই দিচ্ছে, বাতিল যত শক্তিশালী হোক না কেন, আমরা যদি আল্লাহকে ভয় করি, আল্লাহর হুকুম মেনে, ঐক্যবদ্ধভাবে বাতিলের সামনে রুখে দাঁড়াই, তাহলে পৃথিবীর যেকোনো অপশক্তিই ইমানদারদের কাছে পরাজিত হতে বাধ্য। বদরের যুদ্ধ মুসলিম উম্মাহর জন্য এক নিদর্শন ও অনুপ্রেরণা লাভের অন্যতম শিক্ষা। এ যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় এটা প্রমাণ করে যে সত্যনিষ্ঠ কাজে বিজয়ের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ়তা, ধৈর্য ও সহনশীলতার বিকল্প নেই। রমজান মাসে আমাদের প্রার্থনা আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে যেকোনো কাজে সফলতা লাভে কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ় সংকল্প, ধৈর্য ও সহনশীলতা পোষণের তৌফিক দান করুন, যেভাবে তিনি বদর প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীকে তাঁর রহমত দান করেছিলেন, আমিন।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক    

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল