• মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ১১ ১৪৩১

  • || ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

নিজেদের টাকায় বস্তিবাসীর সিসিটিভি, আতঙ্কে অপরাধীরা

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ১৯ মার্চ ২০২৩  

রাত-দিন সিসিটিভি ক্যামেরায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকে তাদের। কেউ যদি কোনও অপরাধ করে পালিয়ে যায়, সিসিটিভির রেকর্ড থেকে অপরাধীকে শনাক্ত করা হবে। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহায়তায় অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে। এলাকায় চুরি, ছিনতাই, মাদক, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এমনিতেই আগে বেশি ছিল। কিন্তু এমন উদ্যোগের ফলে এখন অনেকটাই কমেছে অপরাধের মাত্রা।

স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি কিংবা কাউন্সিলর, কারও সহায়তা ছাড়াই এমন ব্যতীক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানীর মিরপুরের কল্যাণপুর বস্তিবাসী। নিজেদের নিরাপত্তার তাগিদে নিজেদের টাকায় বিভিন্ন সড়কে সিসিটিভি লাগিয়েছে তারা। এতে তাদের খরচ হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।


এ বিষয়ে পুলিশ বলছে, সিসিটিভি থাকার কারণে কোনও অপরাধী তার অপরাধ অস্বীকার করতে পারবে না। এ ছাড়া কোনও নিরীহ মানুষও যেন হয়রানি শিকার না হয়, সেটাও নিশ্চিত হবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে।


শনিবার (১৮ মার্চ) রাজধানীর কল্যাণপুর বস্তি এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বস্তিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক মাসের কিছু সময় আগে থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় নিজেরাই টাকা দিয়ে সিসিটিভি লাগানোর ব্যবস্থা করে বস্তিবাসী।

নিজেদের টাকায় বস্তিবাসীর সিসিটিভি, আতঙ্কে অপরাধীরা
বস্তিবাসীরা বলছেন, সিসিটিভি ফুটেজ লাগানোর পর থেকে অনেক ক্ষেত্রেই মিলছে এর সুফল। বস্তি এলাকার আশপাশে ছিনতাই, মাদক বাণিজ্য, ইভটিজিং কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ছিল অনেক বেশি। এখন অনেকটাই কমে এসেছে।

কল্যাণপুর বস্তিটি ১০টি ভাগে বিভক্ত। ১ থেকে ১০ পর্যন্ত ১০টি নম্বরে ভাগ করা। এখানে সাড়ে ৫ হাজারের অধিক পরিবারের বসবাস। এক-একটি পরিবারে তিন থেকে পাঁচ জন সদস্য রয়েছে। সে হিসাবে ২২ থেকে ২৫ হাজারের মতো জনসংখ্যা।

কল্যাণপুর বস্তির তিনটি প্রধান সড়ক এবং চারটি গলি রয়েছে। এর মধ্যে সিসিটিভি ক্যামেরায় আওতায় এসেছে একটি সড়ক ও দুটি গলি। এখন পর্যন্ত ৯টি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে খরচ হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মতো। যার বেশির ভাগই বস্তিবাসী নিজেরাই জোগান দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে পেরেছে তারা। বাকি টাকা সংগ্রহের চেষ্টা চলমান আছে তাদের। আর এসব ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করছে মিরপুর মডেল থানা পুলিশ।

কল্যাণপুর বাইতুল নূর জামে মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সে বসানো হয়েছে এই সিসিটিভির মনিটর। সেখান থেকেই নজরদারি করা হচ্ছে। পালা করে ডিউটি দিচ্ছেন স্থানীয় তরুণরা। ৯টি সিসিটিভির আওতায় এসেছে ১, ২, ৩, ৪, ৫ ও ৭ নম্বর বস্তির সড়কগুলো। বাকিগুলোতে সিসিটিভি লাগানোর জন্য টাকা সংগ্রহের কাজ চলছে এখন।

নিজেদের টাকায় বস্তিবাসীর সিসিটিভি, আতঙ্কে অপরাধীরা
বস্তিবাসীরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি বোঝাতে পেরেছেন। এরপরই এক উঠোন বৈঠকে সিসিটিভি লাগানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এত টাকা কোথা থেকে আসবে, যখন বিষয়টি আলোচনা হয়, তখন যে যার সাধ্যমতো টাকা দিতে রাজি হয়ে যায়। প্রথম দিনেই ওঠে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। পরে সিসিটিভি কিনে আনলে এগুলো স্থাপনে সহযোগিতা করেন মিরপুর মডেল থানার পুলিশ সদস্যরা।

কল্যাণপুর বস্তি এলাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী আনজু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানোর পর থেকে বস্তি এলাকায় যেসব মাদকের স্পট রয়েছে, সেসব এলাকায় তৎপরতা অনেকটাই কমে গেছে। সিসিটিভির কারণে ছিনতাইও কমেছে। সিসিটিভি লাগানোর পর অপরাধীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

রিকশা গ্যারেজের মালিক জহিরুল ইসলাম বলেন, বস্তিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা আগুন লাগার বিষয়টি। অনেক সময় দেখা যায় কেউ আগুন লাগিয়ে দেয়। আবার কোথাও শর্টসার্কিট বা বিভিন্ন কারণে আগুন লাগে। কিন্তু সিসিটিভি লাগানোর কারণে এসব বিষয় এখন থেকে দেখা যাবে কীভাবে কী হয়।

সিসিটিভি ক্যামেরা পাহারার দায়িত্বে থাকা তরুণ সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা পালা করে সিসিটিভিতে এলাকার বিষয়গুলো দেখভাল করি। রাতের বেলায় যেসব এলাকা নীরব ও লোকসমাগম কম থাকে, সেসব এলাকায়ও সিসিটিভি লাগানো হয়েছে। কয়েক দিন আগে এক মারামারির ঘটনা ঘটে। কী কারণে মারামারি হয়েছে বা কে কার ওপর আগে হামলা চালিয়েছে, বিষয়টি সিসিটিভি দেখেই শনাক্ত করা গেছে।

সিসিটিভি ক্যামেরা মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা বাইতুল নূর জামে মসজিদ মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের সাধারণ সম্পাদক এনামুল হাসান লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মাদক কিংবা ছিনতাইয়ের যেসব স্পট রয়েছে, সেসব স্পট চিহ্নিত করে সিসিটিভি লাগানো হয়েছে। বস্তিবাসীরা তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি বোঝাতে সক্ষম হওয়ায় তারা নিজেরাই সিসিটিভির টাকা জোগাড় করেছে। সিসিটিভির কারণে ইভটিজিং কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের মনে ভয় ঢুকেছে। সিসিটিভি লাগানোর পর থেকে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ অনেকটাই কমেছে। তবে এ উদ্যোগে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি বা কাউন্সিলরের কাছ থেকে কোনও ধরনের সহায়তা পাইনি।

নিজেদের টাকায় বস্তিবাসীর সিসিটিভি, আতঙ্কে অপরাধীরা
কল্যাণপুর বস্তি এলাকার সিসিটিভি পরিচালনা ও তদারকির দায়িত্বে থাকা মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বস্তির যেকোনও বিষয় এখন আমি আমার মোবাইলের সফটওয়্যারের মাধ্যমে দেখতে পাই। যেকোনও সমস্যা সমাধানে কিংবা অপরাধী ধরতে সিসিটিভি অনেক ভূমিকা পালন করছে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, বস্তিবাসীরা নিজেদের নিরাপদ রাখতে সিসিটিভি লাগানোর জন্য নিজেরাই টাকা দিয়েছে।

মিরপুর জোনের সিনিয়র সরকারী পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ মুহতারিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কল্যাণপুর বস্তিতে সিসিটিভি লাগানো রাজধানীর অন্যান্য বস্তির জন্য উদাহরণ। কল্যাণপুর বস্তির মতো অন্য যেসব বস্তি রয়েছে, সেসব বস্তির বাসিন্দারা যদি নিজেদের নিরাপত্তায় এগিয়ে আসে, তাহলে অনেক ধরনের অপরাধ কমে আসবে।

মিরপুর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বস্তিবাসীরা নিজেরা নিরাপদ থাকতে চায়। সব ধরনের অপরাধীরা যেন সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে, এ কারণে তারা এই উদ্যোগে শরিক হয়েছে। অনেকেই মনে করে সিসিটিভি বিলাসিতা। কিন্তু সিসিটিভি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একটি আবশ্যকীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের নিরাপদ রাখতেই সিসিটিভি ব্যবহার করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল