• মঙ্গলবার   ২৪ নভেম্বর ২০২০ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১০ ১৪২৭

  • || ০৯ রবিউস সানি ১৪৪২

আজকের টাঙ্গাইল
৭৬

ইমাম, মুয়াজ্জিনের সম্মানী এবং আমাদের ভুমিকা

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর ২০২০  

মসজিদে আযান দেওয়া লোকটিকে আমরা মুয়াজ্জিন হিসেবে চিনি। আল্লাহ্ আকবর ধ্বনিতে আমাদের ঘুম ভাঙে, তারপর শুরু হয় ফজরের সালাত। আবার আল্লাহ্ আকবর ধ্বনিতে সন্ধ্যার যবনিকা দিয়ে এ'শার সালাতের পরেই অমানিশায় মিলিয়ে যাই আমরা। এভাবে প্রতিদিন ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বেলাল (রাঃ) এর চিরায়ত নিয়মে সুললিত কণ্ঠে আমাদের কে পাঁচবার সালাতের জন্য আহ্বান করে মসজিদের মুয়াজ্জিন। মুয়াজ্জিনের প্রতিদিনকার নামাযের জন্য সঠিক সময়ে যে অাহ্বান করে তাকে যদি বলি চাকরি তবে কঠিন একটা চাকরি, যদি বলি দায়িত্ব তাও কঠিনতম একটি দায়িত্ব। যথাসময়ে মসজিদের মাইকে আযানের ধ্বনিতে মুখরিত হয় মুসলিম জনপদ। আর আমরা যারা সাধারণ মুসল্লি যথাসময়ে সালাতে শামীল হতে না পারলেও সমস্যা নেই, জবাবদীহিতাও নেই কারো কাছে। আর মুয়াজ্জিন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কোনদিন কোন ওয়াক্তে অন্তত ২ থেকে ৪ মিনিট দেরিতে আযান দিলে আপত্তি আর অভিযোগেরও শেষ নেই। আমরা মুসল্লিরা বড়ই তাড়াহুড়ো। নুন্যতম সময়ক্ষেপণ অসহ্য আমাদের। কারণ একটা, আমাদের মসজিদে বেতনধারী মুয়াজ্জিন আছে। তার যথাসময়ের এদিক সেদিক হওয়ার বিষয়ে আমাদের বড়ই আপত্তি থাকার কথা!

 

সময়জ্ঞান নিয়ে চাকরি করা কিংবা দায়িত্ব পালন করার মতো যতগুলো পেশা আছে তার মধ্যে ইমাম-মুয়াজ্জিনের দায়িত্বটা আমার কাছে মনে হয়েছে খুবই কঠিন একটা দায়িত্ব। একজন মুয়াজ্জিনের বেতন বা সম্মানি কতো দিই? তার হিসেব কী সুস্থ মস্তিষ্কে আমরা একবারও চিন্তা করেছি? আমাদের গ্রামিণ জনপদে একজন মুয়াজ্জিনের বেতন বা সম্মানি সাড়ে ৩হাজার থেকে সর্ব্বোচ্চ সাড়ে ৪হাজার টাকা! কোথাও কোথাও একটু ভিন্ন হতেই পারে, তাও নগন্য। এই ক্ষুদ্র পরিমাণ টাকায় তার সংসার চলবে? তার হিসেবটা সমাজের বাবু সাহেবরাই দিয়েন। এরা মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করে মানে এই নয় যে, এদের বেতন নগন্য টাকাই যথেষ্ট। তার যে একটা পরিবার আছে আমাদের মতো, তার যে পরিজন আছে আমাদের মতো। তারও বহুমুখী অভাব আছে সেটা কী একবারও ভেবেছি আমরা? সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা বেতন দিয়েই আপনারা বড়ই দায়সারা। মানে অনেক টাকার বেতন দিয়েছেন! কারণ, আপনারা মসজিদ পরিচালনা কমিটি, আপনারা সমাজপতি, আপনারা পুঁজিপতি। আমোদ-প্রমোদ, আরাম-আয়েশ কেবল আপনাদেরই আছে। আপনাদের চোখে মুয়াজ্জিন সে তো মুয়াজ্জিনই বটে। চোখ বন্ধ করে বিবেকের জানালা খুলে একবার ভাবেন মুয়াজ্জিনকে যা দিচ্ছেন তা কী বেতন নাকি তামাশা? তারপর ভাবেন তাদের যথাসময়ে পালন করা দায়িত্বের কথা।

 

এবার আসি মসজিদের ইমাম নিয়ে। তিনিও মুয়াজ্জিনের আযানে সালাতে শামীল হয় সঠিক সময়ে। তিনিও যথাসময়ে মসজিদে আসেন। ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় মুসল্লিরা কাতারবন্ধী। যদি ইমাম আসতে এক মিনিট দেরি হয় তখন আমাদের বিরক্তির অন্ত থাকেনা। সহ্য করিনা দু'এক মিনিট দেরি! তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করি। একটুও সংযত হই না। কথা একটিই, বেতন ত দিই! যথাসময়ে মসজিদে না আসার মানেই হয় না। হ্যাঁ, বেতন দেন। কতো দেন বেতন? মুয়াজ্জিনকে যা দেন তার দ্বীগুন? তাও না। সাড়ে ৪ হাজার থেকে সর্ব্বোচ্চ সাড়ে ৬ হাজার টাকা। আর একেই বলছেন বেতন দিই! তিনি মুয়াজ্জিনের মতোই যথাসময়ে মসজিদে হাজির। তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জুম'আর নামাযে খুৎবা প্রদান করেন। তিনি ফজরের সালাত শেষে সাধারণ মুসল্লিদের সঠিকভাবে নামায আদায়ের তালিম দেন। স্থানীয় কেউ মারা গেলে জানাযায় ইমামতি করেন। আপনার ছেলে-মেয়ের বিয়েতেও খুৎবাটা পড়ান। অনেকগুলো দায়িত্ব তিনি পালন করেন। এদেরকে যে বেতন বা সম্মানী দিই তা দিয়ে কি তাদের সংসারটা চলে? আমার আপনার সংসারে অন্তত কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় যেখানে টানাপোড়ন চলে সেখানে তাদের কথাও একটু ভাবা উচিত।

 

ইমাম-মুয়াজ্জিন এরা আমাদের ইসলাম ধর্মে অনেক সম্মানী ব্যক্তি। এদেশের শাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ইসলামের অনুশাসনে চলে না বলেই আজ ইমাম-মুয়াজ্জিনের গুরুত্ব আমরা বুঝিনা। কোন কোন মসজিদে ইমাম-মুয়াজ্জিন নিয়োগের জন্য শিক্ষাগতযোগ্যতা চাওয়া হয় আলিম থেকে ফাযিল কিংবা তারও বেশী। চাওয়া হয় পরহেজগারিতা। এটা মোটেও খারাপ না। যোগ্য ইমাম-মুয়াজ্জিন অবশ্যই চাই। তবে, বেতন বা সম্মানীর পরিমাণটা হয় একজন প্রাইভেট কোম্পানীর পিওনের চেয়েও কম। আমাদের লজ্জা থাকার কথা। আমাদের ভেবে দেখা উচিত। আসলেই আমরা কখনো তাদের কথা ভাবিনী। এদের বেতন দিই খুবই কম টাকার। অনেক সময় মসজিদ পরিচালনা কমিটির গড়িমসি তো আছেই। দুই থেকে তিন মাস পেরিয়েও এক মাসের বেতন বুঝে পায় না তারা! আজীব বিষয়। মসজিদে যখন জুম'আর দিন আসে তখন একটা কাঠের বক্স, কাপড়ের ব্যাগ কিংবা টিনের পট (পাত্র) দিয়ে টাকা তুলি তাদের জন্য। এ দায়িত্বটা বেশিরভাগই মুয়াজ্জিনের উপর ন্যাস্ত থাকে। অথচ এদের সম্মানটাও আমরা দিই না। বুঝাতে চাই এটাও তাদের একান্ত দায়িত্ব।

 

মসজিদ পরিচালনা কমিটিতে যারা থাকেন তাদের ধর্মীয় জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করার কিছুই নেই। এদের অনেকেই খুবই প্রতিযোগী। মসজিদকে বড় করতে হবে, সুন্দর কারুকাজে আকর্ষণীয়ভাবে গড়ে তুলতে হবে। টাইলস লাগাতে হবে, ঝকঝকা ফকফকা করতে হবে। প্রয়োজনে এসি/রেফ্রিজারেটর ফিট করতে হবে। দামী দামী আলোক সজ্জা ফিট করতে হবে। পুরোই এয়ার কন্ডিশনে রাখতে হবে। এতে আমার কোন আপত্তি নেই। আল্লাহর ঘর মসজিদ আকর্ষণীয় হোক আমাদের বসতঘর থেকে। এতে কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু যে মসজিদে আরাম আয়েশের সুব্যবস্থা করার সুযোগ হয় সে মসজিদের ইমাম মোয়াজ্জিনের বেতন কেন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের পিওনের চেয়েও কম? কেন তাদের বেলায় আমাদের এতো বৈসম্য? কেন তাদেরকে আমরা সম্মান দেখাতে কার্পণ্য করি? যথাসময়ে দায়িত্ব পালনে একটু এদিক সেদিক হলেই কেন অসহ্য হই। আমাদের উচিত, ইমাম-মোয়াজ্জিনের বিষয়ে আরো সচেতন হওয়া, আরো দায়িত্ববান হওয়া।

 

ইমাম-মোয়াজ্জিনদের সম্মান দিতে শিখুন। ইসলাম ধর্মে এদের সম্মান আকাশচুম্বী। এরা ফুরফুরে প্রানবন্ত থাকুক। এদের পরিবার পরিজন অন্য দশজনের মতোই স্বচ্ছল থাকুক। এদের বেতন নিয়ে আমাদের মানসিকতা উন্নত হোক। যথাযথ সম্মানী প্রদান করা আমাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। মসজিদ-মাদরাসা (ফোরকানিয়া) পরিচালনা কমিটির উচিত একটা নিয়মিত ফান্ডের ব্যবস্থা করা, রিজার্ভ ফান্ড করা। বার্ষিক সভার চাঁদা একটি বৃহত্তম ফান্ড হয়। তারপর সমাজের বিত্তবানদের থেকে ফান্ড কালেক্ট করা। পাশাপাশি বৃহত্তর মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে সরকারে যেই থাকুক পাড়া মহল্লায় গড়ে উঠা মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনের জন্য নুন্যতম একটি ফান্ড প্রদান করার আহ্বান করছি। এসো সালাতে শামীল হই, এসো মসজিদের পানে। সালাত দিয়ে রঙিন করি জীবন।

 

 

লেখক-

শিব্বির আহমদ রানা

(সাংবাদিক ও শিক্ষক)

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল
পাঠকের চিন্তা বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর