• বৃহস্পতিবার   ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ১৩ ১৪২৭

  • || ১৪ রজব ১৪৪২

আজকের টাঙ্গাইল
সর্বশেষ:
দায়িত্ব নিলো গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার নব নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরগণ জামালপুরে মাদক ব্যবসায়ী স্বামী-স্ত্রীকে কারাদন্ড গোবিন্দগঞ্জে ৪ বছরের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি আমিনুর গ্রেফতার গাজীপুর কেজি স্কুল এসোসিয়েশন এর বিশেষ সম্মেলন উল্লাপাড়া উপজেলা আ’লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন: কে কি হচ্ছেন? স্টার্টআপ যশোরের “স্টার্টআপ ক্যাম্প ২০২১” এর সফল সমাপ্তি বকশীগঞ্জে করোনা দুর্যোগে জিআর কার্যক্রম নিয়ে গণশুনানী অনুষ্ঠিত জামালপুরে পৌর নির্বাচন নিয়ে জেলা আ’লীগের সংবাদ সম্মেলন পলাশবাড়ীতে মেয়র ও কাউন্সিলরদের সংবর্ধনা শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করলো যুক্তরাষ্ট্র

আমন ধানের বাম্পার ফলনে উচ্ছ্বসিত কৃষক

আজকের টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ১৬ নভেম্বর ২০২০  

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ অঘ্রাণের ভরা ক্ষেতে দেখেছিলেন মধুর হাসি। কারণ বাতাসে ঢেউ খেলানো সবুজের বিস্তীর্ণ আমন ক্ষেতের শোভা দেখলে মনের মাঝে সৃষ্টি হয় এক অপরূপ সুর তরঙ্গ। মনে তাই আপনা আপনি অনুরণিত হয়- 'হায়রে আমার মন মাতানো দেশ, হায়রে আমার সোনা ফলা মাটি। রূপ দেখে তোর কেন আমার পরাণ ভরে না।' এটা শুধু কবির কল্পনা নয়। আমনের বাম্পার ফলনে দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষকের মনে বয়ে যাচ্ছে খুশির বন্যা। যাদের ঘামে আমাদের মাঠে সোনা ফলে, যাদের শ্রমে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ তারা আজ আনন্দিত উচ্ছ্বসিত। নরসিংদী থেকে আমাদের প্রতিনিধি আমজাদ হোসেন জানান, আমন ধানের সবুজ-শ্যামল দৃশ্য পরিবর্তন হয়ে এখন হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। কোথাও পাকা, কোথাও আধাপাকা। মাঠজুড়ে কৃষকের আবাদ করা আমন ধান ক্ষেতের এমন দৃশ্য সত্যিই মুখে হাসি ফোটার মতো। যেন দৃষ্টিজুড়ে রঙিন কৃষকের মাঠ। যেদিকে তাকাই, যেন দেখি শুধু অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। থোকা থোকা বাড়িঘর, মানুষের বসতি। এরই ফাঁকে ফাঁকে ধানের ক্ষেত। যে ক্ষেতে ফুটে উঠেছে কৃষকের হাসি, কৃষকের স্বপ্ন। সাধারণত আশ্বিন-কার্তিক দু'মাস গরিব কৃষকের ঘরে ভাতের অভাব থাকে। তখন তারা তিন বেলা পেট ভরে খেতে পায় না। কিন্তু যখন অগ্রহায়ণ মাস শুরু হয় তখন নতুন ধান ঘরে আসে। এ সময় কৃষকের ঘরে থাকে আনন্দ। কৃষকবধূরা তৈরি করেন নতুন ধানের, নতুন চালের হরেক রকমের পিঠা। শুরু হয় নবান্নের উৎসব, আমেজ। কৃষকের ঘরে পিঠা তৈরির রেওয়াজ নতুন নয়, পুরনো। কিন্তু এ বছর নরসিংদীর কৃষকের বাস্তবতা একটু ভিন্ন। নতুন ধানের আগমনলগ্নে ভাতের অভাব গোছানোর চেয়ে অনেকে খড়ের অভাব পূরণে ব্যস্ত। টানা বার মাস কিভাবে গরুর প্রধান খাদ্য খড়ের চাহিদা মিটবে, আমন ধানের পাকা ধান ক্ষেতে সেই স্বপ্নই দেখছেন নরসিংদীর অধিকাংশ কৃষক। বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বোরো মৌসুমে অর্থাৎ বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে অতি বৃষ্টির কারণে তারা খড় শুকাতে পারেন নি। যে কারণে গরুর খাদ্য (খড়) চাহিদা অনুযায়ী তারা মজুদ করতে পারেন নি। কৃষকের ভাষায়, 'আমরার কানির কানি ক্ষেতের খ্যাড় (খড়) মেঘে (বৃষ্টিতে) ক্ষেতেই পইচ্ছা (পচে) গেছে', বাইত (বাড়িতে) আনতে পারছি না'। এজন্যই এই শুকনো মৌসুমে অর্থাৎ অগ্রহায়ণ মাসের আমন ক্ষেতের খড়ই আগামী এক বছরের জন্য মজুদ করবেন। আগামী অগ্রহায়ণ মাস আসার আগ পর্যন্ত এই খড় দিয়েই গবাদি প্রাণি অর্থাৎ গো-খাদ্যের চাহিদা পূরণ করবেন। কারণ, বোরো মৌসুমের খড় সংগ্রহ করাটা হবে অনিশ্চিত। বোরো মৌসুমের ধান যখন কাটার সময় হয় তখন থাকে বর্ষা মৌসুম। ওই সময় অতি বৃষ্টির কারণে রৌদ্রে খড় শুকানোর সুযোগ হয় না। যে কারণে আমন ধানের খড়ের উপরই নির্ভরশীল হতে হচ্ছে আগামী এক বৎসরের খোরাক। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার ডৌকারচর ইউনিয়নের তেলিপাড়া গ্রামের রোমান মিয়া, আবুল কালাম এবং ফারুক মিয়াসহ বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে রোববার সকালে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানিয়েছেন, ধান পুরোপুরিভাবে এখনো কাটা শুরু হয়নি। কারণ, ধান পরিপূর্ণ হয়ে এখনো পাকেনি। সম্পূর্ণভাবে পাকতে আরো কয়েক দিন সময় লাগবে। কিন্তু এরইমধ্যে কেউ কেউ ধান কাটছেন শুধু গরুর খাদ্য সংকটের কারণে। তারা জানান, এখন যারা ধান কাটছেন তাদের ঘরে ভাতের খুব একটা অভাব নেই। কিন্তু পর্যাপ্ত অভাব রয়েছে গো-খাদ্যের। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ কৃষকের বাড়িতেই এক বা একাধিক গাভি কিংবা গরু-বাছুর রয়েছে। আর এসব গরু-বাছুরের প্রধান খাবার হচ্ছে ধানের খড়। গত প্রায় দু'মাস যাবৎ খড়ের পর্যাপ্ত জোগান না থাকায় অনেকের গরু-বাছুরই হাড্ডিসার হয়ে গেছে। খড় না থাকায় কেউ কেউ গরু বিক্রিও করে দিয়েছেন। গরুর খামারিদের অধিকাংশই চড়া দামে খাদ্য কিনে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হয়েছে। তবে যেসব কৃষক আমন ধান আবাদ করেছেন তাদের কারোরই লোকসান গুনতে হবে না। প্রায় সব চাষিই লাভবান হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, একদিকে ধানের ফলন ভালো হয়েছে এবং অপরদিকে ধানের খড় বিক্রির চাহিদা প্রচুর। কৃষক রোমান মিয়া জানান, ধানের দাম যা-ই হোক খড়ের দাম চড়া। ধান কাটার আগেই খড় বিক্রি হয়ে যাচ্ছে অনেকের। স্থানীয় পর্যায়ে প্রতি কানি জমির খড় বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। এতে করে কোনো কোনো কৃষকের ধান উৎপাদন খরচ মিটে যাচ্ছে শুধু খড় বিক্রি করেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যাদের গরুর খামার রয়েছে তাদের অধিকাংশেরই খড়ের চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে কৃষকের কাছ থেকে খড় ক্রয় করে। যে কারণে ধানের চেয়ে খড়ের চাহিদা অধিক। নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন ভূইয়া জানান, এ বছর নরসিংদীর ছয়টি উপজেলায় রোপা-আমন ধানের আবাদ হয়েছে মোট ৪১ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে, নরসিংদী সদর উপজেলায় ৩ হাজার ২০০, পলাশে ৩ হাজার ৬০০, শিবপুরে ৯ হাজার ৭৩২, মনোহরদীতে ১০ হাজার ৫০০, বেলাবতে ৫ হাজার ৬৬৮, রায়পুরায় ৮ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে চাষ বা আবাদ হয়েছে। আবাদ করা ধানের জাতের মধ্যে রয়েছে, হাইব্রিড, উফশী এবং স্থানীয় জাত। এরমধ্যে অধিক বা বেশি পরিমাণে চাষ হয়েছে উফশীর ব্রিধান-৪৯। এছাড়া, স্থানীয় জাতের মধ্যে রয়েছে, কালিজিরা, নাইজারশাইল, গান্ধিশাইল, মালতিশাইল, লালধান, তুলশীমালা, বালাম, বিনাশাইল, চিনিগুঁড়া প্রভৃতি। এইচএম মোকাদ্দেস, সিরাজগঞ্জ থেকে জানান, শস্য ভান্ডারখ্যাত চলনবিলসহ সিরাজগঞ্জ জেলায় চলতি মৌসুমে ফসলের মাঠজুড়ে বাতাসে দুলছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন। দফায় দফায় ৫ বারের দীর্ঘমেয়াদি বন্যায় ক্ষতি হওয়ার পরও কৃষি বিভাগ মনে করছে, জেলায় রোপা-আমন মৌসুমে আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে, তাতে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন কৃষকরা। কৃষকের স্বপ্নের রোপা-আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। সাধারণ শ্রমিকদের পাশাপাশি চলনবিলে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর নারী-পুরুষরা দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে মাঠে মাঠে ধান কাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। গত ১৫ দিনে ১০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। শ্রমিক সংকট না হলে আগামী মাসের মাঝামাঝি জেলার কৃষকরা ধান ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করছে কৃষি অধিদপ্তর। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, ৫ বারের বন্যায় জেলার প্রায় ৩ হাজার ৪০৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলায় রোপা-আমনের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৬৯ হাজার ২৫০ হেক্টর ধরা হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বন্যার কারণে লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হয়। শেষ পর্যন্ত ৬৮ হাজার ৪০৬ হেক্টর জমিতে রোপা-আমনের চাষাবাদ হয়। বন্যার কারণে জেলার উপজেলাগুলোতে ৮৪৪ হেক্টর জমিতে আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এবার ফলন বেশ ভালো হয়েছে। উলস্নাপাড়া উপজেলার সোনতলা গ্রামের কৃষক রায়হান আলী বলেন, আমাদের এখনো রোপা-আমন কাটা শুরু হয়নি। ১ সপ্তাহ পড়ে কাটা শুরু হবে। এবারে বন্যা হলেও ধানের ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। রায়গঞ্জ উপজেলার বহ্মগাছা গ্রামের বর্গাচাষি আব্দুল মালেক বলেন, করতোয়া নদীর পাড়ে পতিত এক বিঘা জমিতে রোপা-আমন লাগিয়েছি। ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে। তবে এবার ধানের দাম গতবারের চেয়ে বেশি। তাড়াশ উপজেলার দেশীগ্রাম ইউনিয়নের বলদিপাড়া গ্রামের কৃষক সুলতান আলী বলেন, এবার আমার প্রায় ১৫ বিঘা জমির বপনকৃত রোপা-আমন ধান শুরুতেই হলুদ হয়ে নষ্ট হয়েছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী জমিতে নানা ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করেছি, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লুৎফুন নাহার লুনা বলেন, চলতি মৌসুমে পাঁচবার বন্যায় জলাবদ্ধতার কারণে ১৫০০ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া প্রায় ২০/২৫ বিঘা জমিতে দীর্ঘসময় পানি থাকার কারণে রোপা-আপন ধান হলুদ হয়ে গেছে। পরে অনেক চেষ্টা করেও ওই পরিমাণ ধানের আবাদ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে পাঁচবারের বন্যার পরও তুলনামূলকভাবে ফলন ভালো হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুর রহিম জানান, এবার রোপা-আমন ধানের ফলন ভালো হওয়ায় ৫ দফা বন্যার ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে কৃষক। সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) আবু হানিফ জানান, এবার পাঁচবারের বন্যার কারণে লক্ষ্যমাত্রার কিছুটা কম আবাদ হয়েছে, তারপরও বন্যা ছাড়া ধানের রোগব্যাধি ও অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে। এতে কৃষক তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে বলে উলেস্নখ করেন তিনি।

আজকের টাঙ্গাইল
আজকের টাঙ্গাইল